বইপোকার গল্প বাস্তব জীবনের গল্প "বদনাম" ১ম পার্ট।
বদনাম,
পর্ব-এক
-স্যার ! আমাকে আপনার কেমন লাগে ?
বিন্দুর কথা শুনে গলায় পানি আটকে গেল । খুকখুক করে কেশে উঠলাম । পানির গ্লাসটা রেখে পকেট থেকে ভাজ করা রুমাল বের করে মুখ মুছে আবার রুমালটা পকেটে রেখে দিলাম । বিন্দুর কথায় এতটাই অবাক হয়েছি যে এর মাঝে আমার চোখের পলক একবারও পতন ঘটেনি । চোখ টান টান করে বিন্দুর দিকে তাকিয়ে আছি । বিন্দুও আমার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে । বিন্দুর চোখে আজ আমি অন্য কিছু দেখতে পাচ্ছি । সেখানে কোনো ভয় নেই । লালসার এক অতৃপ্ত চাহনী । আমি আবার কেশে উঠে বললাম
-তুমি যথেষ্ট মেধাবী , ভদ্র একটা মেয়ে ! তোমাকে খারাপ লাগার মতো কোনো ব্যপার থাকা উচিৎ নয় । তাহলে খারাপ লাগার কথা আসছে কেন ?
বিন্দু সরাসরি বলল
-আমাকে কেমন লাগে সেটা বলেন । আমি এত অতিরিক্ত কথা শুনতে অভ্যস্ত নয় ।
আমি ছোট্ট করে বললাম
-ভালোই !
বিন্দু এবার অভিমান করে বলল
-শুধু ভালো ! আর কিছু না !
আমি চশমাটা ঠিক করে বললাম
-আগামীকাল একাউন্টিং পরীক্ষা আছে না ?
-স্যার আপনি কিন্তু কথা ঘুরাচ্ছেন !
-অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়লেই কেউ বড় হয়ে যায় না । বড় হওয়ার জন্য ম্যাচিউরড হতে হয় ম্যাচিউরড !
বিন্দু লজ্জিত হয়ে বলল
-আমার কয়েকটি বান্ধবীদের ছোট ছোট বাচ্চা আছে । আর আমি ছোট হলাম কিভাবে ?
-তাহলে কি আমি আংকেলের সাথে কথা বলবো ?
বিন্দু খুশি হয়ে বলল
-হ্যা বলতে পারেন । তবে আমি যাকে পছন্দ করি তাকেই কিন্তু বিয়ে করবো !
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম
-আজ উঠি ! আমার একটু জরুরী কাজ আছে ।
বিন্দু বিস্মিত হয়ে বলল
-এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন !
আমি ছোট্ট করে বললাম
-হুম !
বিন্দু মন খারাপ করে বলল
-যাওয়ার সময় আপুর সাথে দেখা করে যাবেন । আপু আপনাকে দেখা করে যেতে বলেছে ।
-তোমার আপু কোন রুমে থাকে ?
-এখান থেকে বের হয়ে বামের সামনের রুমে ।
আমি কিছু না বলে বিন্দুর রুম থেকে বের হলাম । রূপুর রুমে আর ঢুকা লাগলো না । আমি বের হয়ে দেখালাম রুপু একটা ছোট্ট প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে । আমি কোনো প্রকার সৌজন্যতা না করেই বললাম
-ডেকেছেন কেন ?
রুপু আমার হাতে ছোট্ট প্যাকেটটা দিয়ে বলল
-আগামী পড়শু আপনার জন্মদিন । সেই উপলক্ষে এই ছোট্ট উপহার ।
আমি অবাক হয়ে বললাম
-আগামী পড়শু জন্মদিন অথচ আজকে গিফটের কারণ কি ?
রুপু হেসে দিয়ে বলল
-আমরা আগামীকাল সিলেটে যাচ্ছি । কয়েকদিন থাকবো । আগামীকাল বিন্দুর পরীক্ষা শেষ হলেই দুজন রওনা দেব । তাই অগ্ৰীম দিলাম ।
-ফিরে এসেও দিতে পারতেন । অপেক্ষা জিনিসটা কষ্টের হলেও এর মাঝে এক ধরনের তৃপ্তি পাওয়া যায় ।
রুপু আবার হেসে বলল
-দিয়েই যেহেতু ফেলেছি , ফেরত নিই কি করে !
আমি কিছু বললাম না । অহেতুক কথা বলা আমার ছোট্ট থেকেই একটা বিরক্তিকর অভ্যাস । আমি চাই না প্রয়োজনের বাইরে কিছু কথা বলতে । রুপু আর আমি একই কলেজে পড়তাম । আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র । রুপু তখন ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয় । এর আগে এই এলাকায় ওদের কখনও দেখিনি । ওরা যেই বাসায় থাকে সেখানে অন্য কেউ থাকতো । এই রাস্তা দিয়ে আমি প্রাই'ই যাওয়া আসা করি । কিন্তু কখনোই ওদের চোখে পড়েনি । পরে একদিন পরিচয় সূত্রে জানতে পারি ওরা এখানে নতুন এসেছে । বিন্দুকে সেই কবে থেকেই পড়াচ্ছি । মেয়েটা বেশ ভালো পড়াশোনাতে ।
ওরা দুই বোন এখানে থাকে । আর বাবা মা থাকে চিটাগাং । আমি বুঝলাম না , চিটাগাং থেকে কুষ্টিয়া পড়তে আসার কারণ কি ! ওদের দুজনের দেখলে মনেই হয় না ওরা বোন । এই বিষয়টা আমাকে খুব ভাবায় । ঈদানীং আমি মনে মনে যা ভাবছি তাই সঠিক হয়ে যাচ্ছে । সন্দেহ করলেই সেগুলো সত্যে পরিণত হচ্ছে ।
সারাদিনে দুইটা টিউশনি করি । পড়াশোনা শেষ । বাবা তার ব্যবসা দেখতে বলেছেন কিন্তু আমি আর কিছুদিন নিজের মতো ঘুরে চলতে চাই । তাই ব্যস্ত থাকার জন্য দুইটা টিউশনি করি । সারাদিন শুধু ঘুরাঘুরি করলেও সময় কাটে না। রাস্তার পাশের এক টং দোকানে বসলাম চা খেতে । মাথাটা ফ্রেশ করা জরুরি । চা খেলে আবার খুধাও কম লাগে । দুই ঘন্টা আরামে পার করে দেওয়া যাই । বাহ ! একটা চায়ের কি দারুন খেল !
চায়ের কাপে একটা চুমুক দিতেই ফোনটা কেঁপে উঠলো । খুব কাছের এক বন্ধু ফোন করেছে । আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম
-হ্যাঁ রুমন বল !
ওপাশ থেকে কেমন হাহাকারের প্রতিধ্বনি ভেসে আসলো । মনে হচ্ছে ওপাশে কষ্টের সাগর । রুমনের কোনো কথায় স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না । কিন্তু এটা বুঝতে পারলাম , আমার এখনই রুমনের বাসায় যাওয়া উচিৎ । আমি আর বসে থাকতে পারলাম না । চায়ের বিল মিটিয়ে রুমনের বাসার দিকে রওনা দিলাম । রুমনের বাসার সামনে বড় ধরনের ভির । আমি ভির ঠেলে ভেতরে ঢুকে অষ্টমাশ্চর্য হলাম ! প্রিতির শরীরের উপর একটা কাপড় দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে । চুল গুলো আউলাঝাউলা , মুখের অবস্থা কেমন যেন । কপালে হালকা রক্তের দাগ । ঘটনাক্রমে বুঝতে পারলাম প্রিতির সাথে খারাপ কিছু হয়েছে । প্রিতি রুমনের ছোট বোন । ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে । আমি এখনও ঘোরের মধ্যে আছি । কি হলো এটা ! এটা তো আমি ! আমার মাথায় ঠিক কাজ করছে না । আমি রুমনের কাছে যেয়ে বসে পড়লাম । রুমন নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে । রুমনের বাবা নেই । মা ছোটবোনকে নিয়েই রুমনের সংসার । কিন্তু মাঝখানে এটা কি হলো ! আন্টি খুবই ভেঙে পড়েছেন । আমি অঝরে কাঁদছি । কাঁদছে আশেপাশের মানুষজন । এমন বিষয়ে কেউ না কেঁদে পারে ! রুমনকে শান্ত করতেই আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে । আমি নিজেও শান্ত থাকতে পারছি না ।
কমিউশনারের ছেলে আর তার একজন বন্ধু মিলে প্রিতিকে ! না এই সম্পর্কে আর ভাবতে পারছি না । প্রিতিকে কখনও আপন বোনের চেয়ে কম চোখে দেখিনি । তার সাথে এমন ঘটনা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না । সেখানে রুমনের কি অবস্থা হবে ! ডাক্তার প্রিতির চিকিৎসা করেনি । বলেছে , পুলিশের ডকুমেন্ট ছাড়া কোনো চিকিৎসা করা হবে না । পুলিশের কাছে ক্যাস করে কোনো লাভ নেই । কমিউশনারের ছেলের বিরুদ্ধে হাজার খুন মাফ । কমিউশনারের ছেলে যদি পঞ্চাশ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট সহ ধরাও পড়ে তা কোর্ট অব্দি যেতে যেতে ইয়াবা ট্যাবলেট ভিটামিন ট্যাবলেটে পরিণত হয়ে যায় । এই আজকের আমাদের সমাজ ! ন্যায় বিচার নেই , আছে শুধু টাকার বিচার । এই দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দেখতে একসময় আমাদের অন্তিম বসন্তের আগমন ঘটে তবুও স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় না । কেন হয় না ? দোষ কার ? টাকার ? না ! টাকার কোনো দোষ নেই । দোষ আমার ! দোষ আমাদের । আমরা প্রত্যেকেই অপরাধী ।
ক্যাস করে লাভ হবে না ! শুধু শুধু অপমান হওয়ার চেয়ে ক্যাস না করাই ভালো । রুমনকে কোনো রকম শান্ত করলেও আন্টিকে শান্ত করা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে । আংকেল মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি কষ্ট করেছেন খুব ।
প্রিতিকে হসপিটালে নিয়ে ভর্তি করে রাখা হলো । ডাক্তার বলেছেন , অবস্থা সিরিয়াস ।
আমি ডাক্তারকে গোপনে ডেকে বললাম
-যা কিছু হয় আমাকে বলবেন প্লিজ । ওদেরকে খারাপ খবর দিবেন না । ওরা নিতে পারবে না ।
ডাক্তার আমার পিঠ চাপড়ে চলে গেলেন । পরেরদিন থেকে প্রিতির শরীর একটু ভালো ।
প্রিতি টুকটাক কথা বলছে । তবে বেশিরভাগ সময়ই একা থাকতে চাচ্ছে । মেয়েদের সত্বীত্ত হরণের চেয়ে বড় সর্বনাশ পৃথিবীর মাঝে আর দুটো নেই । প্রিতির কাছে কিছু শুনতেও পারছি না । এই লজ্জাজনক কথা কিভাবে শুনি ! এটা তো পশুদের দ্বারাও সম্ভব হবে কি না কে জানে । রুমন খুব রেগে গেছে । সে ক্যাস করবেই । আমি রুমনকে নিয়ে একটু সাইডে গেলাম । রুমন বলল
-মিনহাজ তুই যায় বলিস না কেন আমি ওই কমিউশনারের ছেলের নামে ক্যাস করবোই ! প্রিতি আগে সুস্থ হয়ে উঠুক । তারপর দেখ কি করি !
রুমন খুব রেগে কথা গুলো বলল । মানুষের আপন জিনিসের ক্ষতিটা কেউ সহজে নিতে পারে না । প্রত্যেকের মাঝেই একটা ক্ষোভ থাকে । প্রতিশোধের ক্ষোভ । আমি রুমনকে বললাম
-তোর সামনে যখন পুলিশ প্রিতিকে জিজ্ঞেস করবে , ওরা কয়জন ছিল ? কে আগে খারাপ কিছু করেছে ? কিভাবে !
নিতে পারবি এগুলো ? শুনতে পারবি তো ? যদি পারিস তবে যা পুলিশ কাষ্টরীতে । কিন্তু আমি জানি , এইসব শোনার পর তোর নিজেরই মরে যেতে ইচ্ছে করবে । আমি চাই না নতুন করে খারাপ কিছু হোক ।
রুমন চোখ মুখ শক্ত করে আছে । আমার কথাই তো ও নিতে পারছে না । কিন্তু এর থেকে জঘন্যতম জেরা যখন পুলিশ করবে তখন কিভাবে নিবে ? চুপ থাকবে ? এখানে পুলিশের কোনো দোষ নেই । কারণ সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য সকল বিষয় খোলাসা ভাবে জানা উচিৎ । সেটা হোক বাইরে অথবা অভ্যন্তরীণ !
রুমন কিছু বলল না । আমি রুমনকে বললাম
-আমি আবার বিকালে আসবো । কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাস !
.
বেশ কয়েকদিন পর বিন্দু কল দিয়ে জানালো ওরা চলে এসেছে । আমি যেন আজকেই পড়াতে যাই । আমি সেইদিন আর পড়াতে গেলাম না । পরের দিন সকালে বিন্দুর বাড়িতে যেয়ে উপস্থিত হলাম । বিন্দুর মনে খুব খুশি খুশি ভাব । মনে হচ্ছে বিশ্ব জয় করে এসেছে । কেউ কোনো কাজ সফল করলে যেমন করে হাসে বিন্দূর হাসি এবং কথার মাঝে ঠিক তেমনই একটা ভাব প্রস্ফুটিত । আমি কিছু বলতে যাবো ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠলো । রুমন ফোন দিয়েছে । আমার মনে অজানা এক ভয় কাজ করতে শুরু করলো । কি হলো ! খারাপ কিছু হয়নি তো ! প্রিতি তো অনেকটুকু সুস্থ হয়ে গেছে । তাহলে ? কল রিসিভ করতেই রুমন বলল
-দোস্ত তুই এখন কই আছিস ?
-আমি টিউশনিতে আছি ।
রুমন খুশিন্বিত মনোভাব করে বলল
-নেট অন কর একটা ছবি দিচ্ছি দেখ ।
আমি বুঝলাম না একটা ছবিতে কি এত খুশির খবর থাকতে পারে । নেট অন করে বসে রইলাম । রুমনের আইডি থেকে ম্যাসেজ আসলো । ম্যাসেজ অপেন করে ছবির দিকে তাকাতেই আমার চোখ বড় বড় আকার ধারণ করলো । আমি চমকে উঠলাম । এক প্রকার লাফিয়ে উঠে বসার জায়গা পরিবর্তন করলাম । বিন্দু অবাক হয়ে বারবার বলছে
-স্যার কি হলো আপনার ? স্যার ! স্যার !
বিন্দুর কথা আমার কানে স্পষ্ট যাচ্ছে না। আমি যেন কানে না শোনা এক অন্ধ মানুষ ।
চলবে...
.
#বদনাম
.
লিখা --মিনহাজ মাহমুদ
পর্ব-এক
-স্যার ! আমাকে আপনার কেমন লাগে ?
বিন্দুর কথা শুনে গলায় পানি আটকে গেল । খুকখুক করে কেশে উঠলাম । পানির গ্লাসটা রেখে পকেট থেকে ভাজ করা রুমাল বের করে মুখ মুছে আবার রুমালটা পকেটে রেখে দিলাম । বিন্দুর কথায় এতটাই অবাক হয়েছি যে এর মাঝে আমার চোখের পলক একবারও পতন ঘটেনি । চোখ টান টান করে বিন্দুর দিকে তাকিয়ে আছি । বিন্দুও আমার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে । বিন্দুর চোখে আজ আমি অন্য কিছু দেখতে পাচ্ছি । সেখানে কোনো ভয় নেই । লালসার এক অতৃপ্ত চাহনী । আমি আবার কেশে উঠে বললাম
-তুমি যথেষ্ট মেধাবী , ভদ্র একটা মেয়ে ! তোমাকে খারাপ লাগার মতো কোনো ব্যপার থাকা উচিৎ নয় । তাহলে খারাপ লাগার কথা আসছে কেন ?
বিন্দু সরাসরি বলল
-আমাকে কেমন লাগে সেটা বলেন । আমি এত অতিরিক্ত কথা শুনতে অভ্যস্ত নয় ।
আমি ছোট্ট করে বললাম
-ভালোই !
বিন্দু এবার অভিমান করে বলল
-শুধু ভালো ! আর কিছু না !
আমি চশমাটা ঠিক করে বললাম
-আগামীকাল একাউন্টিং পরীক্ষা আছে না ?
-স্যার আপনি কিন্তু কথা ঘুরাচ্ছেন !
-অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়লেই কেউ বড় হয়ে যায় না । বড় হওয়ার জন্য ম্যাচিউরড হতে হয় ম্যাচিউরড !
বিন্দু লজ্জিত হয়ে বলল
-আমার কয়েকটি বান্ধবীদের ছোট ছোট বাচ্চা আছে । আর আমি ছোট হলাম কিভাবে ?
-তাহলে কি আমি আংকেলের সাথে কথা বলবো ?
বিন্দু খুশি হয়ে বলল
-হ্যা বলতে পারেন । তবে আমি যাকে পছন্দ করি তাকেই কিন্তু বিয়ে করবো !
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম
-আজ উঠি ! আমার একটু জরুরী কাজ আছে ।
বিন্দু বিস্মিত হয়ে বলল
-এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন !
আমি ছোট্ট করে বললাম
-হুম !
বিন্দু মন খারাপ করে বলল
-যাওয়ার সময় আপুর সাথে দেখা করে যাবেন । আপু আপনাকে দেখা করে যেতে বলেছে ।
-তোমার আপু কোন রুমে থাকে ?
-এখান থেকে বের হয়ে বামের সামনের রুমে ।
আমি কিছু না বলে বিন্দুর রুম থেকে বের হলাম । রূপুর রুমে আর ঢুকা লাগলো না । আমি বের হয়ে দেখালাম রুপু একটা ছোট্ট প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে । আমি কোনো প্রকার সৌজন্যতা না করেই বললাম
-ডেকেছেন কেন ?
রুপু আমার হাতে ছোট্ট প্যাকেটটা দিয়ে বলল
-আগামী পড়শু আপনার জন্মদিন । সেই উপলক্ষে এই ছোট্ট উপহার ।
আমি অবাক হয়ে বললাম
-আগামী পড়শু জন্মদিন অথচ আজকে গিফটের কারণ কি ?
রুপু হেসে দিয়ে বলল
-আমরা আগামীকাল সিলেটে যাচ্ছি । কয়েকদিন থাকবো । আগামীকাল বিন্দুর পরীক্ষা শেষ হলেই দুজন রওনা দেব । তাই অগ্ৰীম দিলাম ।
-ফিরে এসেও দিতে পারতেন । অপেক্ষা জিনিসটা কষ্টের হলেও এর মাঝে এক ধরনের তৃপ্তি পাওয়া যায় ।
রুপু আবার হেসে বলল
-দিয়েই যেহেতু ফেলেছি , ফেরত নিই কি করে !
আমি কিছু বললাম না । অহেতুক কথা বলা আমার ছোট্ট থেকেই একটা বিরক্তিকর অভ্যাস । আমি চাই না প্রয়োজনের বাইরে কিছু কথা বলতে । রুপু আর আমি একই কলেজে পড়তাম । আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র । রুপু তখন ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয় । এর আগে এই এলাকায় ওদের কখনও দেখিনি । ওরা যেই বাসায় থাকে সেখানে অন্য কেউ থাকতো । এই রাস্তা দিয়ে আমি প্রাই'ই যাওয়া আসা করি । কিন্তু কখনোই ওদের চোখে পড়েনি । পরে একদিন পরিচয় সূত্রে জানতে পারি ওরা এখানে নতুন এসেছে । বিন্দুকে সেই কবে থেকেই পড়াচ্ছি । মেয়েটা বেশ ভালো পড়াশোনাতে ।
ওরা দুই বোন এখানে থাকে । আর বাবা মা থাকে চিটাগাং । আমি বুঝলাম না , চিটাগাং থেকে কুষ্টিয়া পড়তে আসার কারণ কি ! ওদের দুজনের দেখলে মনেই হয় না ওরা বোন । এই বিষয়টা আমাকে খুব ভাবায় । ঈদানীং আমি মনে মনে যা ভাবছি তাই সঠিক হয়ে যাচ্ছে । সন্দেহ করলেই সেগুলো সত্যে পরিণত হচ্ছে ।
সারাদিনে দুইটা টিউশনি করি । পড়াশোনা শেষ । বাবা তার ব্যবসা দেখতে বলেছেন কিন্তু আমি আর কিছুদিন নিজের মতো ঘুরে চলতে চাই । তাই ব্যস্ত থাকার জন্য দুইটা টিউশনি করি । সারাদিন শুধু ঘুরাঘুরি করলেও সময় কাটে না। রাস্তার পাশের এক টং দোকানে বসলাম চা খেতে । মাথাটা ফ্রেশ করা জরুরি । চা খেলে আবার খুধাও কম লাগে । দুই ঘন্টা আরামে পার করে দেওয়া যাই । বাহ ! একটা চায়ের কি দারুন খেল !
চায়ের কাপে একটা চুমুক দিতেই ফোনটা কেঁপে উঠলো । খুব কাছের এক বন্ধু ফোন করেছে । আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম
-হ্যাঁ রুমন বল !
ওপাশ থেকে কেমন হাহাকারের প্রতিধ্বনি ভেসে আসলো । মনে হচ্ছে ওপাশে কষ্টের সাগর । রুমনের কোনো কথায় স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না । কিন্তু এটা বুঝতে পারলাম , আমার এখনই রুমনের বাসায় যাওয়া উচিৎ । আমি আর বসে থাকতে পারলাম না । চায়ের বিল মিটিয়ে রুমনের বাসার দিকে রওনা দিলাম । রুমনের বাসার সামনে বড় ধরনের ভির । আমি ভির ঠেলে ভেতরে ঢুকে অষ্টমাশ্চর্য হলাম ! প্রিতির শরীরের উপর একটা কাপড় দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে । চুল গুলো আউলাঝাউলা , মুখের অবস্থা কেমন যেন । কপালে হালকা রক্তের দাগ । ঘটনাক্রমে বুঝতে পারলাম প্রিতির সাথে খারাপ কিছু হয়েছে । প্রিতি রুমনের ছোট বোন । ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে । আমি এখনও ঘোরের মধ্যে আছি । কি হলো এটা ! এটা তো আমি ! আমার মাথায় ঠিক কাজ করছে না । আমি রুমনের কাছে যেয়ে বসে পড়লাম । রুমন নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে । রুমনের বাবা নেই । মা ছোটবোনকে নিয়েই রুমনের সংসার । কিন্তু মাঝখানে এটা কি হলো ! আন্টি খুবই ভেঙে পড়েছেন । আমি অঝরে কাঁদছি । কাঁদছে আশেপাশের মানুষজন । এমন বিষয়ে কেউ না কেঁদে পারে ! রুমনকে শান্ত করতেই আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে । আমি নিজেও শান্ত থাকতে পারছি না ।
কমিউশনারের ছেলে আর তার একজন বন্ধু মিলে প্রিতিকে ! না এই সম্পর্কে আর ভাবতে পারছি না । প্রিতিকে কখনও আপন বোনের চেয়ে কম চোখে দেখিনি । তার সাথে এমন ঘটনা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না । সেখানে রুমনের কি অবস্থা হবে ! ডাক্তার প্রিতির চিকিৎসা করেনি । বলেছে , পুলিশের ডকুমেন্ট ছাড়া কোনো চিকিৎসা করা হবে না । পুলিশের কাছে ক্যাস করে কোনো লাভ নেই । কমিউশনারের ছেলের বিরুদ্ধে হাজার খুন মাফ । কমিউশনারের ছেলে যদি পঞ্চাশ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট সহ ধরাও পড়ে তা কোর্ট অব্দি যেতে যেতে ইয়াবা ট্যাবলেট ভিটামিন ট্যাবলেটে পরিণত হয়ে যায় । এই আজকের আমাদের সমাজ ! ন্যায় বিচার নেই , আছে শুধু টাকার বিচার । এই দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দেখতে একসময় আমাদের অন্তিম বসন্তের আগমন ঘটে তবুও স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় না । কেন হয় না ? দোষ কার ? টাকার ? না ! টাকার কোনো দোষ নেই । দোষ আমার ! দোষ আমাদের । আমরা প্রত্যেকেই অপরাধী ।
ক্যাস করে লাভ হবে না ! শুধু শুধু অপমান হওয়ার চেয়ে ক্যাস না করাই ভালো । রুমনকে কোনো রকম শান্ত করলেও আন্টিকে শান্ত করা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে । আংকেল মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি কষ্ট করেছেন খুব ।
প্রিতিকে হসপিটালে নিয়ে ভর্তি করে রাখা হলো । ডাক্তার বলেছেন , অবস্থা সিরিয়াস ।
আমি ডাক্তারকে গোপনে ডেকে বললাম
-যা কিছু হয় আমাকে বলবেন প্লিজ । ওদেরকে খারাপ খবর দিবেন না । ওরা নিতে পারবে না ।
ডাক্তার আমার পিঠ চাপড়ে চলে গেলেন । পরেরদিন থেকে প্রিতির শরীর একটু ভালো ।
প্রিতি টুকটাক কথা বলছে । তবে বেশিরভাগ সময়ই একা থাকতে চাচ্ছে । মেয়েদের সত্বীত্ত হরণের চেয়ে বড় সর্বনাশ পৃথিবীর মাঝে আর দুটো নেই । প্রিতির কাছে কিছু শুনতেও পারছি না । এই লজ্জাজনক কথা কিভাবে শুনি ! এটা তো পশুদের দ্বারাও সম্ভব হবে কি না কে জানে । রুমন খুব রেগে গেছে । সে ক্যাস করবেই । আমি রুমনকে নিয়ে একটু সাইডে গেলাম । রুমন বলল
-মিনহাজ তুই যায় বলিস না কেন আমি ওই কমিউশনারের ছেলের নামে ক্যাস করবোই ! প্রিতি আগে সুস্থ হয়ে উঠুক । তারপর দেখ কি করি !
রুমন খুব রেগে কথা গুলো বলল । মানুষের আপন জিনিসের ক্ষতিটা কেউ সহজে নিতে পারে না । প্রত্যেকের মাঝেই একটা ক্ষোভ থাকে । প্রতিশোধের ক্ষোভ । আমি রুমনকে বললাম
-তোর সামনে যখন পুলিশ প্রিতিকে জিজ্ঞেস করবে , ওরা কয়জন ছিল ? কে আগে খারাপ কিছু করেছে ? কিভাবে !
নিতে পারবি এগুলো ? শুনতে পারবি তো ? যদি পারিস তবে যা পুলিশ কাষ্টরীতে । কিন্তু আমি জানি , এইসব শোনার পর তোর নিজেরই মরে যেতে ইচ্ছে করবে । আমি চাই না নতুন করে খারাপ কিছু হোক ।
রুমন চোখ মুখ শক্ত করে আছে । আমার কথাই তো ও নিতে পারছে না । কিন্তু এর থেকে জঘন্যতম জেরা যখন পুলিশ করবে তখন কিভাবে নিবে ? চুপ থাকবে ? এখানে পুলিশের কোনো দোষ নেই । কারণ সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য সকল বিষয় খোলাসা ভাবে জানা উচিৎ । সেটা হোক বাইরে অথবা অভ্যন্তরীণ !
রুমন কিছু বলল না । আমি রুমনকে বললাম
-আমি আবার বিকালে আসবো । কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাস !
.
বেশ কয়েকদিন পর বিন্দু কল দিয়ে জানালো ওরা চলে এসেছে । আমি যেন আজকেই পড়াতে যাই । আমি সেইদিন আর পড়াতে গেলাম না । পরের দিন সকালে বিন্দুর বাড়িতে যেয়ে উপস্থিত হলাম । বিন্দুর মনে খুব খুশি খুশি ভাব । মনে হচ্ছে বিশ্ব জয় করে এসেছে । কেউ কোনো কাজ সফল করলে যেমন করে হাসে বিন্দূর হাসি এবং কথার মাঝে ঠিক তেমনই একটা ভাব প্রস্ফুটিত । আমি কিছু বলতে যাবো ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠলো । রুমন ফোন দিয়েছে । আমার মনে অজানা এক ভয় কাজ করতে শুরু করলো । কি হলো ! খারাপ কিছু হয়নি তো ! প্রিতি তো অনেকটুকু সুস্থ হয়ে গেছে । তাহলে ? কল রিসিভ করতেই রুমন বলল
-দোস্ত তুই এখন কই আছিস ?
-আমি টিউশনিতে আছি ।
রুমন খুশিন্বিত মনোভাব করে বলল
-নেট অন কর একটা ছবি দিচ্ছি দেখ ।
আমি বুঝলাম না একটা ছবিতে কি এত খুশির খবর থাকতে পারে । নেট অন করে বসে রইলাম । রুমনের আইডি থেকে ম্যাসেজ আসলো । ম্যাসেজ অপেন করে ছবির দিকে তাকাতেই আমার চোখ বড় বড় আকার ধারণ করলো । আমি চমকে উঠলাম । এক প্রকার লাফিয়ে উঠে বসার জায়গা পরিবর্তন করলাম । বিন্দু অবাক হয়ে বারবার বলছে
-স্যার কি হলো আপনার ? স্যার ! স্যার !
বিন্দুর কথা আমার কানে স্পষ্ট যাচ্ছে না। আমি যেন কানে না শোনা এক অন্ধ মানুষ ।
চলবে...
.
#বদনাম
.
লিখা --মিনহাজ মাহমুদ
No comments