একটি রহস্য গল্প || ব রহস্য || Mystery Novel
ব রহস্য
[ পর্ব ১+২+৩]
- " আমি যাকেই বয়ফ্রেন্ড বানাই না কেন, কিছুদিন পরে সে সুইসাইড করে মারা যাবেই।আমি নিজেকে এখন অভিশপ্ত একজন মেয়ে মনে করছি। এ ব্যাপারে তোমার কাছে কোন সল্যিউশন হবে?"
- " আপনার নাম?"
- "লিন্ডা।"
বর্ণ : আপনার প্রেমে পরে এখন পর্যন্ত কতজন সুইসাইড করেছে?
.
লিন্ডা: টুয়েলভ।
.
বর্ণ: আপনার এতগুলো বয়ফ্রেন্ড থাকা এবং তাদের সুইসাইডের ঘটনা দুটোই অস্বাভাবিক লাগছে। তবে সুইসাইড এর ব্যাপারটা কাকতালীয়ভাবে হতেই পারে। এ পৃথিবীতে অনেক অস্বাভাবিক ঘটনা স্বাভাবিক ভাবেই ঘটে যায়।
.
লিন্ডা: "সেটা অসম্ভব বর্ণ। দেখো, তুমি আমাকে পাগল ভেব না। ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস। কেউ ই চায় না এই হাজার মানুষের মাঝে নিজের কপালে একজন অভিশপ্ত মানুষের ট্যাগ লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে।আমার ই বা কি হবে? সারাজীবন কি একা একা ই থাকব? আংকেল বলেছিলো তুমি ভালো একজন গোয়েন্দা। তাই তোমার কাছে কোন সলিউশন পাই কিনা সে জন্য এসেছি।"বিশ্বাস করো আমাকে,আমার জীবন ও ঝুঁকিপূর্ণতার মধ্যে কাটছে।
.
বর্ণ : আপনি কিভাবে শিওর হলেন যে এটা কোন কাকতালীয় ঘটনা না?
.
লিন্ডা: তাদের সুইসাইড নোট।
বর্ণ: আপনি দেখেছিলেন সব গুলো??
.
লিন্ডা: হ্যাঁ দেখেছি।সব গুলো না হলেও বেশ কিছু দেখেছি। এমনকি এ সুইসাইড নোট গুল ইটালীয়ান পুলিশ দের ও মাথা খেয়েছে। সব গুলো সুইসাইড নোটে একটা অদ্ভুত ধাঁধা লেখা ছিলো। ভাগ্য ভাল এসব সুইসাইডের ঘটনা নিউজপেপারে বা মিডিয়ায় আসে না। তাহলে উলটো সবার সাথে আমার সম্পৃক্তা থাকার কারণে আমাকেই সিরিয়াল কিলার ভেবে আটক করা হত। এখনো পর্যন্ত এই ১২ জনের মৃত্যু যে আমার দ্বারা লিংকড আপ সেটা গোপন আছে। এমনকি পুলিশের কাছে সুইসাইড নোট গুলর একে অপরটার সাথে মিলে যাওয়ার তথ্যটিও তারা পায় নি।
.
বর্ণ : তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন একই শহরে আপনার দুজন প্রেমিক ছিল না। রাইট?
.
লিন্ডা: এক্সাক্টলি। ইটালীর সেম শহরে আমার একটার বেশি বয়ফ্রেন্ড ছিল না।
তুমি চাইলে আমি তোমাকে কিছু সুইসাইড নোট এর ছবি দেখাতে পারি। আর হা, আমি বয়সে তোমার বড় হব না।আমাকে তুমি করে বললেই আমি বেটার ফিল করব।
.
বর্ণ: শিওর।
.
লিন্ডা গ্যালারি থেকে ফোন বের করে কিছু ছবি স্লাইড করে। বর্ণ সেখানে আত্মহত্যা করা প্রেমিক দের সুইসাইড নোটের ছবি দেখতে পায়। কিন্তু সেখানে শেষ লাইনটাই শুধু এলফাবেটিক। বাকি লাইন গুলতে বেশ কিছু নম্বর এলোমেলো ভাবে সজ্জিত রয়েছে।
অদ্ভুত ভাবে ৬ টা সুইসাইড নোটের লেখাই এক।মাত্র ছয়টি ছবি ই লিন্ডা সংগ্রহ করতে পেরেছিল।বাকিগুলোতেও এরকম লেখা ছিল বলে তার ধারণা।ছয়টি
সুইসাইড নোটেই লেখা ছিল,
1,2,4,7
1,5,5,4,4,
3,3,6,2
It's pleasant to die.
ছবিগুলো দেখে কপালে মৃদ্যু ঘাম চলে আসে বর্ণের।
ইটালী এসে এরকম একটা রহস্যের সন্ধান পাবে বুঝতে পারে নি সে।
রহস্যের সমাধান দিতে পারবে কিনা সেটা সম্পর্কে বর্ণ নিশ্চিত নয়। তবে বর্ণ আগ্রহী, ভেতরকার রহস্যটুকু জানার জন্য। নিজ থেকেই সে লিন্ডাকে উদ্দেশ্যে করে বলে,
মাত্র কাল ই ইটালী পৌঁছালাম। তুমি চাইলে থাকলে আমাকে নিয়ে কফি খেতে যেতে পারো। বাকিটা গল্প করতে করতে জেনে নিব।
লিন্ডা: তুমি ইটালী আসবে শুনেছিলাম আরো চার দিন আগেই। জহির আংকেলের কাছে তোমার অনেক গল্প শুনেছি। তুরাণ, তুমি আর জহির আংকেল মিলে নাকি অনেক বড় বড় কেস সলভড করেছ। মূলত আংকেল ফোনে আমার কাছে এমন ভাবে তোমার কথা উপস্থাপন করেছেন যে আমি তোমার ব্যাপারে নির্ভরতা পেয়েছি, সেদিন ই সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমার সাথে আমার এই গোপনীয় ব্যাপারটা শেয়ার করব। নিজের ভিতরে এত্ত বড় একটা সিক্রেট চেপে রাখতেও আমার কষ্ট হচ্ছিল। খুব ডিপ্রেশনে থাকতাম ব্যাপারটা নিয়ে।
.
বর্ণ: তুমি জানো না লিন্ডা, জহির আংকেল ভয়ানক চাপাবাজ, আমার ব্যাপারে নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলেছেন।
.
লিন্ডা: আচ্ছা তা বলুক। তাও তোমার সাথে কথাটা শেয়ার করে আমার ভালো লাগছে । দেখো কোন কূল কিনারা পাও কিনা। আমি এখন আসি। বিকেলে আবার আসব। কফি খেতে বের হয়ে গল্প করা যাবে আরো। রেডী থেকো।
বর্ণ : বেশ!
লিন্ডা বর্ণের ফেসবুক আইডি সংগ্রহ করে তখনকার মত প্রস্থান করে।
লিন্ডা যাওয়ার পরেই সাথে সাথে নোটবুক বের করে বর্ণ,
কিছু কিছু ব্যাপার নোট করে রাখা জরুরী। ধরা যাক লিন্ডার সব কথা সত্যি ,ওর কথাগুল বিশ্লেষণ করলে কিছু ব্যাপারে খটকা লেগে যায় ,
তা হল নম্বরের ব্যাপার টা, নম্বর গুলো যে একটা ধাঁধাঁ সেটা লিন্ডা কিভাবে বুঝলো!!
র্যানডমলি কোন লেখাও তো হতে পারে। তার মানে লিন্ডা জানে বা আন্দাজ করেছে নম্বরগুলতে হয়তো লুকানো কোন তথ্য রয়েছে। আবার একই শহরে লিন্ডার দু জন বয়ফ্রেন্ড ছিল না। এটাকে কি কাকতালীয় বলা যায়? নাকি ওয়েল প্লানড!
লিন্ডার দ্বারা যদি সুইসাইড গুলো প্রভাবিত হয়ে থাকে, তবে সে নিজেই এই রহস্যের সমাধান খুঁজবে কেনো!
ছোট খাট গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট গুল নোট করে রাখে বর্ণ।
এর মাঝেই রুমে প্রবেশ করেন মি. জাকির। খুবই গুরু গম্ভীর একজন মানুষ। জহির আংকেলের আপন ভাই হলেও তার কথাবার্তার ধরণ এবং বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দুটোতেই আকাশ পাতাল পার্থক্য।যদিও মধ্যবিত্ত জহির আংকেলকেই বর্ণের বেশি পছন্দ। জহির আংকেল কে আংকেল ডাকার সুবাদে মি. জাকির হোসেন কে শুরু থেকেই আংকেল বলে ডেকে আসছে বর্ণ। লিন্ডা তার ই একমাত্র মেয়ে।
এখানে থাকতে কোন প্রকার অসুবিধে হচ্ছে কিনা খোঁজ নেয়ার জন্য ই জাকির হোসেন উপস্থিত হয়েছেন, তিনি পেশায় সাংবাদিক। মূলত তার একটা আর্টিকেল পড়েই বর্ণ এখানে উপস্থিত হয়েছে।কিন্তু সেটা জাকির সাহেব নিজেও জানেন না। তার অফিসের গেস্ট রুমেই বর্ণের থাকার ব্যাবস্থা হয়েছে।
অবশ্য গেস্ট রুম টা অফিসের মূল কক্ষ থেকে সম্পূর্ন আলাদা। অফিস বন্ধ থাকলেও দিন রাত ২৪ ঘন্টাই গেস্ট রুম থেকে বাইরে যাওয়া আসা করা যায়।
জাকির হোসেন এসেই দেশের গল্প জুড়ে দিলেন।ছোট ভাই জহিরের খবর নিলেন।দীর্ঘ ২২ বছর এই ইটালীতেই পরে আছেন তিনি। দেশে যাওয়া হয়নি তার। সর্বশেষ দেশ থেকে বিয়ে করার পরে বৌ নিয়ে চলে এসেছিলেন ।
তার দেড় বছর পরেই লিন্ডার জন্ম। জহির আংকেলের কথা উঠিয়ে আফসোস করলেন জাকির সাহেব ।তিনি অনেক বার ইটালী নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন ছোট ভাই জহির কে। কিন্তু তিনি দেশের মাটি ছাড়তে চান না।
খোঁজ খবর নেয়ার পালা শেষ হলে জাকির হোসেন বর্ণকে সাময়িক বিদায় জানান। যাওয়ার আগে বলে যান, যে কোন প্রয়োজনে তাকে জানানোর জন্য এবং যতদিন খুশি ইটালীতে অবস্থান করার জন্য।অবশ্য জাকির হোসেন কথায় কথায় বার বার জানার চেস্টা করছিলেন হঠাৎ ইটালীতেই কেন আসলো বর্ণ, তার চোখে মুখে কেমন যেন একটা উৎকন্ঠা কাজ করছিল সব সময়। বর্ণের গোয়েন্দাগিরির কথা জাকির হোসেনের অজানা নয়। তার এই অজ্ঞাত উৎকন্ঠার কারণ নিয়ে ভাবার ফুসরৎ নেই বর্ণের। আপাতত একটা বিষয় নিয়েই মাথা ঘামানো যাক। ওহ হো!! ভুল হলো,আপাতত দুটো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো যাক।
.
লিন্ডার ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করার পর নিজ থেকেই বর্ণকে নক করলো সে। জানালো আজ সকালে বাসায় গিয়ে ঘুম দিয়েছিল লিন্ডা,ঠিক তখনই ঘুমের মাঝে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে সে।
বর্ণ স্বপ্নের গল্প গুজব শুনতে আগ্রহী নয়। তবুও লিন্ডা যখন বলল, স্বপ্নটা তোমকে ঘিরে দেখা হয়েছে বর্ণ।
স্বাভাবিক ভাবেই তখন বর্ণ জানতে চাইলো,
"কেমন ছিলো তোমার স্বপ্ন?
লিন্ডা বলতে শুরু করলো... আমি দেখলাম
" ল্যান্ডফোন এ রিং হচ্ছে। একটা মেয়ে ঘড়িতে দেখলো তখন রাত প্রায় ১১:১৫ বাজে। তার গায়ে তখনও পড়া ছিলো ব্লু ইউনিফর্ম, পিজা ডেলিভারি দেয়াটা ছিল তার জব। ১১ টায় শপ বন্ধ হয়ে গেলেও গুছিয়ে নিতে নিতে ১১:১৫ বেজে যায় । ঠিক তখন ই পিজা ডেলিভারী চেয়ে একটা কল আসে ।
বিরক্ত সহকারে মেয়েটা ফোন পিক করে। ৭ টা পিজা ডেলিভারি নেয়ার জন্য কেউ একজন ফোন করেছে। প্রথমে ডেলিভারি দিতে পারবে না বলে ফোন রেখে দিলেও ওপাশ থেকে প্রতি পিজার জন্য ২০% এক্সট্রা পে মেন্ট দিবে বলে অফার করায় রাজি হয় মেয়েটি।
গাড়ি নিয়ে রওনা দেয় লোকেশন অনুযায়ী।
কিন্তু জায়গাটা ছিল অনেক দূরে।শহর থেকে বের হয়েও ৪ কিলোমিটার ড্রাইভ করতে হয় মেয়েটির। অবশেষে ঝোপ ঝাড়ের মধ্য দিয়ে উপস্থিত হয় একটা পুরানো গোছের দ্বীতল ভবনের বাড়ির সামনে।
শিশ বাজাতে বাজাতে পিজার প্যাকেট গুলো গাড়ির ব্যাক সিট থেকে নামায় মেয়েটি। দরজার সামনে গিয়ে দেখে স্ক্রাচ করা দরজার গায়ে।পুরোনো কাঠের দরজা। কোন কলিংবেল নেই। বাধ্য হয়ে দরজার উপর আংগুল দিয়ে নক করে মেয়েটি। ঠক ঠক ঠক...
ওপাশে শুনশান নিরবতা। কোন সাড়া শব্দ নেই। কিছুক্ষন পরে সে গলা ছেড়ে ডাক দেয়,
Hello, your pizza is here.....
সে ডাক প্রতিধ্বনি হয়ে মেয়েটার কানে ফিরে আসে।
অনেকটা উইয়ার্ড সিচুয়েশন এ পরে সে।
সিদ্ধান্ত নেয় পিজা গুলো নিয়ে দোকানে ফিরে যাবে। পরিবেশ ভাল লাগছে না তার।
ঠিক এমন সময়, দরজার ওপাশ থেকে ঠক ঠক ঠক করে তিনটি নক হয়। আকাশ থেকে পরে মেয়েটি। দরজার ভিতর থেকে কেন কেউ নক করতে যাবে??
দরজার সামনে গিয়ে আবার দাঁড়ায় সে। হঠাৎ তার চোখ চলে যায় দরজার পাশে থাকা জানালার দিকে। সেদিকে তাকানোর সাথে সাথেই সে প্রচন্ড ভয় পায়। মনে হচ্ছে শত শত মানুষের চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। কোন মাথা দেখা যাচ্ছে না। শুধু সাদা সাদা অনেক গুল চোখ পলক ফেলছে তার দিকে তাকিয়ে। সাথে সাথে 911 এ ফোন করে মেয়েটি। পুলিশ লোকেশন ট্রাক করে সেখানে পৌঁছে যায়। কিন্তু ততক্ষনে বেশ দেড়ি হয়ে গিয়েছে। পিজার ডেলিভারি দিতে নেয়া গাড়িটি পাওয়া যায় সেই বাসার দ্বিতীয় তলায়। গাড়িটির ভিতরে পরে চারটি লাশ। কিন্তু অবাক করা বিষয় গাড়ির সামনের সিটের লাশ দুটি এবং পেছনের সিটের লাশ দুটির চেহারা এবং জামা কাপড় একই রকম ছিল। সব শেষে আমি দেখতে পাই এ রহস্যটা সমাধান করার জন্য তুমি ইটালীতে এসেছো। এর পরেই আমার ঘুম ভেংগে যায়।
.
.
যেন আকাশ থেকে পরে বর্ণ। মি. জাকির সাহেব কয়েকদিন আগেই এই ঘটনা নিয়ে একটা আর্টিকেল লিখেন। তবে এত বিস্তারিত না। সাঞ্জে নামের একটা মেয়ে ডিউটি টাইম শেষ হওয়ার পর ও পিজা ডেলিভারি দিতে গিয়ে কোন এক সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং পুলিশকে ইনফর্ম করে।
পুলিশ সেখানে গিয়ে উপস্থিত হওয়ার পর, সাঞ্জে কে না পেয়ে পুরো বাড়িটায় তল্লাশি চালায়।বাড়িটির দোতলায় তারা ডেলিভারি দেয়ার জন্য নিয়ে আসা গাড়িটি খুঁজে পায় এবং প্রতিটি সিটে একটা করে মৃত সাঞ্জেকে দেখতে পায়। পুরো পৃথিবীব্যাপি রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায় খবরটি। কিন্তু অনেকেই এটাকে ফেক ভেবে উড়িয়ে দেয়। জহির আংকেলের কাছ থেকে বর্ণ প্রথম এ ঘটনাটা জানতে পারে। খুব অল্প সময়ে একটা গাড়িকে না ভেংগে চুরে পুরানো ঘরের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠানো আবার সেখানে একই ব্যক্তির চারটে লাশ পাওয়া টা কল্পনার ও বাইরে। এটা নিয়ে সিক্রেট গবেষনা চালানোর জন্য ইটালীর সরকার নিজেই এই তথ্যকে ভুয়া বলে সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ কনফিডেন্সিয়াল তথ্য শুধুমাত্র ইটালীর বড় বড় সাংবাদিক এবং প্রশাসনের লোকদের ভিতরে সীমাবদ্ধ ছিল। সাংবাদিক যারা এ ঘটনার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত তাদের ভিতরে জাকির হোসেন অন্যতম।
কিন্তু বর্ণ এ ব্যাপারটা নিয়ে ইনভেস্টিগেট করতে এসেছে এটা বাইরের কেউ জানতে পারলে বর্ণের আর ইটালীতে থাকা হবেনা। তাই সে নিজের ভিতরে বিষয়টি চেপে রেখে চুপি চুপি কাজ সারতে চেয়েছিল।
কিন্তু লিন্ডা? সে স্বপ্নে এতটা বিস্তারিত ঘটনা এবং বর্ণের ইনভেস্টিগেশন এর ব্যাপারে সব দেখে ফেলল কিভাবে!! মাথা ব্লাংক হয়ে আসে বর্ণর।
লিন্ডাকে সে সেদিন বিকেলে আসতে নিষেধ করে। কাজে ব্যস্ত থাকার নাম করে একটা ঘটনার সাথে অন্য ঘটনার মিল খোঁজার চেষ্টা করতে থাকে।এ যেন এক অদ্ভুত দুনিয়ায় বসবাস করছে বর্ণ। এত বড় রহস্য সমাধান করার কথা কল্পনাও করতে পারছে না সে। শুধু মাত্র রহস্যটা কি সেটা জানার জন্য ঘাটাঘাটি করার প্রচন্ড ইচ্ছে তার ভিতর কাজ করতে থাকে।
রাতে সামান্য কিছু খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় বর্ণ। ইটালীর এই ছোট্ট শহর নেপলস থেকে একটু দূরে অবস্থিত প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত পাম্পেই নগরী হয়ত বর্ণের জন্য এক বুক রহস্য ধারণ করে আছে।চারজন সাঞ্জের লাশ পাওয়া গিয়েছল পাম্পেই নাগরীর এক পরিত্যক্ত বাড়িতে। এই পাম্পেই কে আগেই অভিশপ্তদের শহর বলে মানা হত।
৭৯ খ্রিস্টাব্দে ভিসুভিয়াস পর্বতের আগ্নেয়গিরির ২ দিনব্যাপী চলা ভয়াবহ অগ্নুৎপাতে পম্পেই নগরী সম্পূর্ণভাবে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। তখন এ নগরীটি ৬০ ফুট উঁচু ছাই এবং ঝামাপাথরের নিচে শহরটি চাপা পড়ে যায়। কারলো দি বোরবোনে-এর আর্থিক সহায়তায় শহরটি ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় মাটির নিচ থেকে আলোতে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু এখনো সেখানে কোন প্রকার জনবসতি গড়ে উঠে নি। তবে ঐ পরিত্যক্ত ঘরে কাদের বসবাস ছিল? এসব ভাবতে ভাবতে রাত ক্রমশ গভীর হয়ে আসে। লাইট অফ করে বর্ণ ঘুমাতে চেষ্টা করে একটু।রাত প্রায় তিনটা।
মনে মনে চিন্তা করে রহস্যের জালটাকে ছিড়তে হলে প্রথমে কোথা দিয়ে শুরু করা যায়!! এজন্য তাকে জাকির আংকেলের সাহায্য নিতে হবে। একটা অস্থায়ী জার্নালিস্ট এর আইডি কার্ড করে নিলে যে কোন জায়গায় যাওয়ার অনুমতি পেতে তেমন অসুবিধে হবে না।তুরাণ কে এই সময়ে খুব মিস করছে বর্ণ। জহির আংকেল এখানে থাকলে আরো ভাল হত। তিনজন আলাপ আলোচনা করতে করতে ঠিক একটা উপায় বের হয়ে আসত।
হঠাৎ বর্ণ তার জানালার কাঁচে ধুম ধাম আওয়াজ শুনতে পায়। কেউ যেন কিল ঘুষি মারছে। ৭ তলা উঁচু এই বিল্ডিং এর জানালায় বাইরে থেকে এমন কিল ঘুষির আওয়াজ এ হতচকিত হয়ে লাফ দিয়ে উঠে বসে সে। দৌড়ে জানালার কাছে যায় সে। রুমের লাইট অফ। বাইরে তখন রোডলাইটের আলো। মৃদু আলোতে থাই গ্লাসের বাইরে দাঁড়ানো সেই জাকির আংকেলের ভয়ার্ত মুখ টা দেখতে পায় বর্ণ। কিন্তু সে বর্ণের জানালার সামনে বাতাসে ভেসে দাঁড়িয়ে আছে। বর্ণ তাড়াতাড়ি করে জানালা খুলে বাইরে তাকায়, এক ঝাপটা হাওয়া প্রবেশ করে রুমের ভিতরে। বাইরে আর কিছুই নেই। কিন্তু জানালার কাঁচে যেটা আছে সেটা বর্ণের হৃদপিন্ড কাঁপিয়ে দিতে যথেষ্ট।
জানালার কাঁচে জমা ধুলোর উপরে আঙুল ঘুরিয়ে লেখা হয়েছে,
1,2,4,7
1,5,5,4,4,
3,3,6,2
It's pleasant to die.
জানালার থাই গ্লাসে লেখাটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে বর্ণ। কি হল এটা? মাথায় কিছু খেলছে না তার।
এমন সময় বর্ণের ফোনে একটা কল আসে, জাকির আংকেলের ফোন থেকে...
কম্পিত হাতে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে লিন্ডার গগন বিদারী চিৎকার ভেসে আসে। ওর বাবা, জাকির হোসেন মিনিট দুয়েক আগেই নিজের গলায় নিজে বেশ কয়েকবার এলোপাথাড়িভাবে ছুড়ি চালিয়ে সুইসাইড করেছেন।.....
নিজের গলায় নিজেই বারবার ছুড়ি চালিয়ে আত্মহত্যা, ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। সাইকোলজিক্যাল ভাবে ব্যখ্যা করলে এক ব্যক্তি কিছুতেই গলার ভিতরে একবারের বেশি ছুড়ি চালনা করবে না। একটু আগে সপ্তম তলার জানালার ওপাশে ভাসমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন জাকির আংকেল। আংগুল ঘুড়িয়ে কাঁচের উপরে লিখেছিলেন সেই দুর্বোধ্য সংখ্যাগুচ্ছ। পাম্পেই নগরীর সেই পরিত্যক্ত বাড়ি, লিন্ডা, সাঞ্জে এরা সবাই কি একই সূত্রে গাঁথা!! ভাবতে ভাবতে বাকি রাতটুকু না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিল বর্ণ। পরদিন সকালে বর্ণের গেস্ট রুমে কিছু অপরিচিত লোকজন আসে। লোক গুলো এসে বর্ণকে-জামা কাপড় সহ ব্যাবহার্য যা যা জিনিসপত্র আছে তা সব কিছু গুছিয়ে নিতে বলে।লিন্ডা লোক পাঠিয়েছে বর্ণকে তাদের নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।
রেডি হতে বেশ কিছুক্ষন লেগে যায় বর্ণর। গত রাতে কাঁচের উপরে লেখা সংখ্যাধাঁধাগুলো এখনো স্পষ্ট। মোবাইল ফোন বের করে লেখাটির কিছু ছবি তুলে নেয় সে। পরবর্তী তে কাজে লেগে যেতে পারে।
লিন্ডার বাসায় পৌঁছাতে বেশি সময় লাগে নি। পুলিশ সকালেই জাকির সাহেবের রুমটা তালাবদ্ধ করে লাশ নিয়ে গিয়েছে পোস্ট মর্টেম এর জন্য।
লিন্ডার অবস্থা ও শোচনীয়। এত বড় ধাক্কা সামলাতে পারে নি। চিৎকার করে কাঁদছে এখনো। বর্ণকে দেখার পর যেন তার কষ্ট আরো কিছুটা বেড়ে গেল। লিন্ডা কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল বর্ণকে। কিন্তু কান্নায় বার বার জড়িয়ে আসছিল তার কন্ঠ।লিন্ডার কথা গুলো গোঙ্গানির আওয়াজে রূপান্তর হয়ে যাচ্ছিল। লিন্ডাকে সান্তনা দেয়ার মত ভাষা বর্ণের নেই।সে ব্যাগ থেকে এটিভেন নামের একটা ট্যাবলেট বের করে গ্লাসের পানিতে গুলিয়ে দেয়।এটি একটি হাই পাওয়ারফুল ঘুমের ঔষধ। লিন্ডাকে সুস্থ ও সাবলীল রাখতে হলে এখন ওর কান্না থামাতে হবে। সুতরাং ৮/৯ ঘন্টার জন্য ঘুম পাড়িয়ে দেয়ার আয়ডিয়াটা যথাযথ বলেই মনে হচ্ছিলো বর্ণের কাছে।ঔষধটার স্বাদ নরমাল। পানিতে গোলালেও তাই স্বাদের কোন পরিবর্তন আসে না। বর্ণ পানির গ্লাস হাতে লিন্ডার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। লিন্ডা তখন বালিশ চাপা দিয়ে কান্না করছিল।চোখ গুলো ফুলে লাল হয়ে আছে। সর্দি আর চোখের পানি মিলে পুরো চেহারাটার বিশ্রি একটা অবস্থা হয়ে ছিল। একটা টাওয়েল নিয়ে বর্ণ লিন্ডার চোখ মুখ মুছে দেয়। লিন্ডার বয়স যখন মাত্র ১২ তখন তার মা হঠাৎ করেই এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। এরপর মা এবং বাবার আদর দুটোই পেতো জাকির সাহেবের কাছ থেকে। আজ সেই শেষ অবলম্বন টুকুও হারিয়ে ফেলল লিন্ডা।ওর জায়গায় যে কেউ হলেই প্রচন্ড ভেংগে পড়ত। পানির গ্লাসটা লিন্ডার মুখের সামনে ধরে বর্ণ। চোখ মেলে একবার বর্ণের দিকে তাকিয়ে মাথা এপাশ ওপাশ ঝাকায়, পানি খেতে অস্বীকৃতি জানায় সে।
কাল রাতের এবং আজকের ঘটনায় বর্ণের মানষিক অবস্থাও খুব একটা স্টাবল ছিল না। সে একটু জোর করেই লিন্ডাকে অন্তত পানি টুকু খাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। সাথে এটাও বলে, আমি আছি তোম সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। যদিও বর্ণ নিজেই খেয়াল করছিল, পানির গ্লাস ধরা অবস্থায় তার হাত কাঁপছে। লিন্ডার মুখের সামনে ধরতেই একটু চুমুক দিয়ে অল্প কিছু পানি খেয়ে নেয় সে। পরে নিজেই বর্ণের হাত থেকে গ্লাস নিয়ে ঢক ঢক করর পুরো পানিটা খেয়ে ফেলে। কাল রাতের ঘটনার পর থেকে ভয়,দু:খে গলা শুকিয়ে আসলেও হয়ত একটু দানাপানি ও ছোয় নি মেয়েটা। কিছুক্ষনের ভিতরে ঘুমিয়ে পরবে মেয়েটা ভেবে গ্লাস হাতে উঠে চলে আসে বর্ণ। বাইরে প্রচন্ড ভীড়। সাংবাদিক এবং সিকিউরিটি গার্ড দের। তারা ভীড় ঠেলে বাসার ভিতরে ঢুকে লিন্ডার সাক্ষাতকার নেয়ার জন্য আগ্রহী। যে চ্যানেল সবার আগে লিন্ডার সাক্ষাতকার নিতে পারবে সে চ্যানেল ই যেন সব থেকে বেশি হিট হবে, এমন একটা ধারণা বিরাজ করছে জার্নালিস্ট দের মধ্যে। শত হলেও রহস্যজনক মৃত্যু। পুলিশ লাশটা উদ্ধার করার সময় ছুড়িটা তার গলার ভিতরেই বিদ্ধ অবস্থায় পায়। ডান পাশ থেকে কাত হয়ে ঢুকে স্বরনালী ভেদ করে বের হয়ে রয়েছিল অপর প্রান্ত থেকে।
ইতিমধ্যেই জাকির সাহেবের মত ডেডিকেটেড একজন জার্নালিস্ট এর এরকম মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন ইটালী এর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা রা।
বাসার সামনের দিকের ভিড়ে একটু উঁকি দেয় বর্ণ। সাথে সাথে তাকে উদ্দেশ্য করে সাংবাদিক দের চিৎকার চেঁচামিচি শুরু হয়ে যায়। একদল আবর্জনা যেন এসে বর্ণের কানে ঢুকে গেল এমন একটা অবস্থা। বাইরে কিছু পুলিশ ছিল যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ বাড়ির ভিতরে ঢুকে পরতে না পারে। তাদের একজনকে গিয়ে বর্ণ বলে আসে, লিন্ডা খুবই অসুস্থ। সে এখন কোন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে পারবে না। তারা যেন চলে যায়।
সিকিউরিটি পুলিশ তাদেরকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে। একে একে সব ভীড় কমে যায়। বাইরের জটলা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে যায়।
বাসায় দুজন হেল্পিং হ্যান্ড আছে। দুজনেই মমধ্যবয়সী মহিলা। তারা রান্না সেরে ঘরদোর গুছিয়ে চলে যায়। লিন্ডা তার রুমে ঘুমাচ্ছে। বর্ণ ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে টিভি অন করে।টিভি অন করার পর ই নড়েচড়ে বসতে হয় তাকে। পুলিশ যখন লাশটাকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিল তখন জার্নালিস্ট রা লাশটির কিছু ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম হন। প্রায় সব নিউজ পোর্টালেই এই একটা নিউজ ই দেখাচ্ছে। টিভি বন্ধ করে দেয় বর্ণ।
সোফার উপর হেলান দিয়ে শুয়ে থাকে। রাতে ঠিকভাবে না ঘুমাতে পারায় আস্তে আস্তে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় সে।ঘুম ভাংগে বাসার বাইরে ঝগড়ার শব্দে। ব্যাপার কি! উঠে বসে বর্ণ। আস্তে আস্তে গিয়ে দরজা খুলে। বাসার বাইরে তখনও পুলিশের দুজন কর্মী দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের ই একজন একটা মাঝবয়সী লোকের কলার শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আরেকজনের হাতে ইলেক্ট্রিক টেজার। পালানোর কোন রাস্তা নেই। সেই লোকটাই বারংবার চিৎকার করে তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে। সামান্য মারামারি ও বোধ হয় হয়েছিল। ।লোকটার নাক ফেটে রক্ত পরছে। পাশেই পরে আছে একটা পুরোনো আমলের ক্যামেরা। ওদের কথাবার্তা শুনে বর্ণ আসল ঘটনা বুঝতে পারে। জাকির সাহেবের রুমের সাথে লাগোয়া একটা সরু গাছ রয়েছে। সিকিউরিটির চোখ ফাঁকি দিয়ে সেই গাছে উঠে ছেলেটা রুমের ভিতরের ছবি তুলতে চেয়েছিল।কিন্তু পুরোনো মডেলের ক্যামেরাটাই তাকে বিপদে ফেলল। একটু মাত্রাতিরিক্ত শব্দ হওয়ায় সিকিউরিটি পুলিশের দায়িত্বে থাকা দুজিনের চোখ চলে যায় গাছের ডালে। এরপর সেখান থেকে নামিয়ে উত্তম মাধ্যম দিয়ে ধরে রাখা হয়েছে। একটু পর পুলিশের গাড়ি এসে তাকে নিয়ে যাবে।
বর্ণ চট করে লেদারের কালো জ্যাকেট টা গায়ে চাপিয়ে পুলিশদুজনের কাছে চলে গেল। গিয়ে নরম গলায় বলল, এক্সকিউজ মি, স্যার, হি ইজ লিন্ডা'স রিলেটিভ। হট ওয়াজ হিজ ফল্ট? বর্ণর মুখে এরকম স্যার ডাক শুনে তাদের মন কিছুটা শান্ত হয়ে গিয়েছিল। তারা দুজন বর্ণকে বুঝাতে চেষ্টা করছিল, সে গাছে উঠে উঁকি দিয়েছে , গাছ থেকে নামতে বলার পর দৌড়ে পালাতে চেয়েছে,
বর্ণ তাদের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কানে উপরে মাথার কাছে আংগুল নিয়ে একটু ঘুরালো ও মুখে ভেংচি কাটল। পুলিশ দুজনকে সে বুঝাতে চাইলো লোকটার মাথায় সমস্যা আছে। লোকটার দিকে তাকিয়ে বর্ণ সজোরে ধমক দিয়ে ইংলিশে বলল, এক্সকিউজ মি, লিন্ডা ইজ কলিং ইউ, গো ইনসাইড হোম।
ধমকের সাথে সাথে যে পুলিশটি লোকটির কলার ধরে ছিল, সে জামার কলার থেকে হাত সরিয়ে নিল। ছাড়া পেয়ে লোকটি ভাংগা ক্যামেরার টুকরোগুল জড়ো করে একটা কনফিউশন নিয়ে বাসার ভিতরের দিকে পা বাড়ালো। ভদ্রতার খাতিরে, " আই এম রিয়েল্যি সরি ফর দ্যাট ইন্সিডেন্স " বলে পুলিশ দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিল বর্ণ।
বাসায় ঢুকে দরজা লাগিয়ে সোফার উপরে বসাল লোকটিকে। এরপর ভিতরে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে দিল তাকে। লোকটি খুব দ্রুত সে পানি খেয়ে শেষ করে ওয়াশরুম কোথায় জানতে চাইল। বর্ণ দেখিয়ে দিল।
ফ্রেশ হয়ে এসে লোকটি ভাংগা ভাংগা ইংরেজীতে তাকে যা বলল, তার অর্থ এটাই, " আমি বুঝেছি আপনি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছেন। বিশ্বাস করুন আমি এজন্য কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমাকে বাঁচিয়ে আপনার লাভ কি?"
বর্ণ পায়ের উপর পা উঠিয়ে বসে তাকে কনফিডেন্টলি জিজ্ঞেস করে, ডু ইউ নো? হু আই এম? লোকটি কাচুমাচু হয়ে গুটিয়ে যায়। উত্তরে বলে, নো স্যার, সরি স্যার।
বর্ণ: এপোলোজি এক্সেপ্টেড।
বর্ণ এবং মাঝ বয়সী লোকটার সাথে এরপর যে কথাবার্তা হয়, সেটার অনুবাদ ;
বর্ণ : আপনার নাম কি?
লোকটি: ক্রিশ্চান তাইসন।
বর্ণ: পেশা?
তাইসন: নির্দিষ্ট কোথাও আমি কাজ করি না। সাংবাদিকদের কাছে ফটোগ্রাফি বিক্রি করাটাই আমার কাজ।এজন্য আমি বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করি। পরে ছবিগুল জার্নাল দের কাছে নিয়ে যাই। যারা দাম বেশি বলে তাদের কাছেই দেই।
শুনে অনেকটা নিরাশ হয়ে যায় বর্ণ।
তার মানে উনি প্রফেশনাল সাংবাদিক না, আর ওনার কাছে কোন আইডি কার্ড ও নেই।
বর্ণ: আপনি তো প্রফেশনাল জার্নালিস্ট না। আসলে আমি বর্ণ, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর।
বলা যায় ছোট খাট একটা মিশন নিয়ে এসেছি। এজন্য আমার অনেক তথ্য লাগবে। জাকির আংকেলের সাহায্যে একজন জার্নাল এজেন্টের আইডি কার্ড করিয়ে নিলে তথ্যগুল সংগ্রহ করা যেত। কিন্তু তিনি তো...
ভেবেছিলাম আপনার সাথে ডিল করব। আপনি আমার হয়ে তথ্য এনে দিবেন কিন্তু আপনিও তো প্রফেশনাল না।
তাইসন: স্যার, আপনি জানেন না, আমি প্রফেশনাল না হলেও লাইন ঘাট সব চিনি। বলতে দ্বিধা নেই আমি চাটুকারিতা করেই দু পয়সা কামাই। কোথায় কিভাবে কি করলে আপনার প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে তা আমি সব জানি। আপনি আপনার মিশন এ আমাকে সাথে রাখতে পারবেন। এই পবিত্র ক্রস ছুয়ে কথা দিচ্ছি সব কিছু আমাদের মাঝে গোপন রাখব।
গোয়েন্দারা কাউকেই বিশ্বাস করেনা। বর্ণ ও তাইসন কে বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু বর্ণ তো আর কাচা খেলোয়াড় নয়। সে ঠিকই জানে কিভাবে একজনকে ১০০% ব্যাবহার করতে হয়। একবার তো বর্ণকে খুন করার জন্য এসেছিল একজন,তাকেও ব্যাবহার করে নিজের কাজ করিয়ে নিয়ে, পরে বিশাক একটা সারপ্রাইজ দিয়েছিল লোকটি কে।
যাই হোক, তাইসন কে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে অসুবিধে হবে না। যাক, কাজ শুরু করার একটা উপায় তো পাওয়া গেল।
তাইসন কে খেতে দেয় বর্ণ।
খাওয়ার সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি সত্য কথা বলে, পাম্পেই নগরীর সেই বাসাটা সম্পর্কে গল্পের ছলেই বর্ণ জানতে চায় তাইসনের কাছে। তাইসন গড় গড় করে অনেক তথ্য বলে দেয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা চারটে সাঞ্জের লাশের ভিতরে একটার সাথে অপরটির একটুও তফাৎ ছিল না। বাসার ভিতর থেকে গাড়িটিকে নিয়ে এসে গবেষনার এ রাখা হয়েছে। এছাড়া আর তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। বাসাটার চারপাশে কিছুদিন পুলিশের পাহাড়া ছিল কিন্তু ঘরটি পুরোপুরি ফাঁকা থাকায় এখন আর তেমন কোন পাহাড়াদার নেই।তবে অদ্ভুত কিছু ঘটে কিনা সেটা জানার জন্য ক্যামেরার আওতাধীন রাখা হয়েছে পুরো ঘরটি কে। মজার ব্যপার হল,পিজার প্যাকেটগুল সব খালি ছিল। সেই খালি প্যাকেটটি ও গবেষণাগার এ আছে।
-এখান থেকে পাম্পেই এর সেই ঘরে যেতে কতক্ষন লাগবে তাইসন ?
- ২ ঘন্টার মত।
- তুমি যাবে? আমরা তাহলে ঘরটা ঘুরে দেখে আসতাম একটু।
- কবে যেতে চাচ্ছেন??
ঘড়ির দিকে তাকায় বর্ণ। বিকেল ৬ টা। সন্ধ্যা হয়ে এল বলে। আজ রাতে একটা ট্রিপ দেয়ার সময় আছে যথেষ্ট।
তবে লিন্ডাকে একা বাসায় রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।
এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন সে।
লিন্ডার রুমে গিয়ে একবার ঢু মেরে আসে বর্ণ। বেঘোরে ঘুমাতে ঘুমাতে বিছানার একদম পাশে চলে এসেছে লিন্ডা। একটু হলেই নিচে পরে যাবে এমন একটা অবস্থা। বর্ণ গিয়ে লিন্ডাকে বিছানার মাঝে রাখার জন্য এক হাত দু পায়ের হাঁটুর মাঝে নিচে রেখে অন্য হাত লিন্ডার কাঁধের নিচে দিয়ে নিয়ে ওকে জাগিয়ে বিছানার মাঝ বরাবর নিতে চেষ্টা করে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আরেকবারের জন্য ধাক্কাটা খায় বর্ণ। লিন্ডাকে এক চুল পরিমান ও নড়াতে পারছে না সে। একজন সিমসাম মেয়ের দেহ এত্ত পরিমান ভারী হতে পারে তা ধারণার বাইরে ছিল তার। লিন্ডার মুখমন্ডল এখনো লাল হয়ে আছে। চোখের চারপাশ ফুলে আছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে স্বাভাবিক ভাবেই। কিন্তু দেহ এতটা ভারী কেন!! নাকি বর্ণের শক্তি কমে গেল!! নিয়মিত জিম করা একটা ছেলে একজন মেয়েকে তুলতে পারছে না, বর্ণের নিজের ভিতরে একিটু অপমানবোধ ও কাজ করতে লাগল । নিজের শক্তি পরীক্ষা করার জন্য ড্রয়িং রুমে চলে যায় সে। খেয়ে দেয়ে সোফার উপরে ঘুম দিয়েছে তাইসন। বর্ণ একটু ইতস্ততবোধ করে আস্তে আস্তে তাইসনের হাটুর নিচ দিয়ে হাত দিয়ে অপর হাত ঘাড়ের নিচে দিয়ে উপরে তোলার চেস্টা করতেই খুব সহজেই তাইসন একদম বর্ণের আড়কোলে চলে আসে। হঠাৎ ঘুম ভেংগে যায় তাইসনের। নিজেকে বর্ণের কোলে আবিষ্কার করে সে হাসবে,কাঁদবে, নাকি লাফ দিয়ে নিচে পরবে তা বুঝতে পারে না।তার মুখে এমন একটা ভাব ফুটে উঠলো, যেন সে ফেঁসে গিয়েছে কোথাও। বর্ণ তাইসন কে নিরাপদ ভাবে সোফায় নামিয়ে রাখে। সিচুয়েশন টা বুঝতে পেরে তাইসনকে বলে, ভয় নেই।নিজের শক্তি টা একটু পরীক্ষা করলাম , অভিযানে যেতে হবে তো!! বর্ণ ওকে এটাও বুঝিয়ে বলে, লিন্ডা যাতে তাইসনকে বর্ণের ফ্রেন্ড হিসেবেই জানে।কি হচ্ছে,
তাইসন কিছু বুঝতে না পেরে ভ্যাবাচেকা খেয়ে বসে থাকে কিছুক্ষন। বর্ণ লিন্ডার রুমে যায়। ৮ ঘন্টার বেশি সময় ধরে লিন্ডা ঘুমাচ্ছে। এবার তাকে জাগানোর চেস্টা করা উচিৎ। জাগানোর আগে সর্ব শক্তি দিয়ে বর্ণ লিন্ডাকে উঠাতে চেস্টা করে শেষবারের মত। কিন্তু ফলাফল সেই একই। বিন্দু পরিমান নাড়াতেও সক্ষম হয় নি সে। তবে বর্ণ অনুমান করতে পারে, ভার টা আসলে লিন্ডার বাম পাশে খুবই বেশি।
.
চোখে মুখে পানির ছিটা দিতেই আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকায় লিন্ডা। চোখ মেলে বর্ণকে দেখে চুপচাপ কিছুক্ষন শুয়ে থাকে সে। বর্ণ কথা বলার চেস্টা করে লিন্ডার সাথে।
লিন্ডা খুব আস্তে আস্তে উঠে বসে। শরীর ভীষন ক্লান্ত তার।
চোখ থেকে গড়িয়ে আবার পানি নেমে আসে।
বর্ণ লিন্ডাকে বুঝাতে চেষ্টা করে, যেটা হয়েছে সেটা খুব অস্বাভাবিক, এটার রহস্যভেদ করতে হলে লিন্ডার সাহায্যের দরকার পরবে সবচেয়ে বেশি। বর্ণ সিচুয়েশন একটু হালকা করতে লিন্ডাকে নিজের গল্প শোনায়, নিজের মা বাবা দুজনেই খুব করুণ ভাবে মারা গিয়েছে,এমন একটা গল্প বানিয়ে বলে ফেলে সে। বর্ণ বুঝতে পারে লিন্ডা আগের থেকে কিঞ্চিৎ পরিমান বেটার ফিল করছে। কিন্তু ওর সাথে আলোচনা করার মত সিচুয়েশন আসে নি এখনো। অনেক কষ্টে ওর সাথে কথা বলে বাসায় কাজ করা একজন বুয়ার নাম্বার সংগ্রহ করে তাকে ফোন দেয় বর্ণ। আজ রাতে লিন্ডার সাথে থাকার জন্য অফার করে। প্রথমে রাজি না হলেও কিছু টাকা পয়সার লোভ দেখানোর পরে ঠিকই রাজি হয়ে যায়।
এক ঘন্টার ভিতরেই কাজের বুয়া তার ১৬ বছরের মেয়ে সহ লিন্ডার বাসায়, লিন্ডার সাথে রাতে থাকার জন্য চলে আসে।বর্ণ খুশি হয় খুব। আজ রাতে তাহলে পাম্পেই নগরীর পরিত্যক্ত ঘর টা ঘুরে দেখা যাবে।
কিন্তু ক্যামেরা গুল থাকলে তো সমস্যা। সিসি ক্যামেরার লাইন গুল কেটে দেয়া পসিবল হবে কিনা সেটাও একটা চিন্তা।
তাইসন তার ক্যামেরাটা যতটা পারে জোড়া তালি দেয়ার চেস্টা করছে। বর্ণ গাছের উপর থেকে তোলা জাকির সাহেবের রুমের ছবিটা দেখতে ইচ্ছা প্রকাশ করলো তাইসনের কাছে।
তাইসন ক্যামেরার গ্যালারী থেকে ছবি টা বের করে বর্ণের হাতে দিল।
ছবিটা হাতে নিয়ে বর্ণ বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল। প্রতিটা জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলো। দেয়ালের অনেক জায়গায় ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে।
জামা কাপড়, বই খাতা গুল সব ছড়ানো ছিটানো।বিছানার উপরে ক্যাপ খোলা একটা কলম পরে আছে। তবে কি তিনি সুইসাইড করার আগে কিছু লিখছিলেন!! থাই গ্লাসের একটু ফাঁকা জায়গা থেকে ক্যামেরা ধরে বেশ বিস্তারিত একটা ছবি তুলেছে তাইসন। অভিজ্ঞ আছে ভাল ই বলা যায়। বর্ণ বেশ কিছুক্ষন ছবির দিকে মনোযোগ দিয়ে ডুবে ছিল,
হঠাৎ তাইসন এর ধাক্কায় হুঁশ ফেরে তার। ডায়নিং রুম থেকে জাকির সাহেবের বাসার দরজাটা দেখা যায় স্পষ্ট।
আংগুল দিয়ে তাইসন বর্ণকে সেদিকে দেখিয়ে দেয়। বর্ণ দরজার দিকে তাকায়।
ঠিক তিন সেকেন্ড পর পর একটা শব্দ ভেসে আসছে,
টুক..... টুক..... টুক...
মনে হচ্ছে কেউ বড় নখ ওয়ালা একটা আংগুল দিয়ে দরজার উপরে টোকা মেরে চলেছে।
ওপাশের ঘরে কাজের বুয়া লিন্ডাকে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। এদিকে তাইসন চলে গেলে পাম্পেই নগরীর ঘরটা ঘুরে দেখার মত অভিজ্ঞ লোক পাওয়া যাবে না। বর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, তাইসন কে নিয়ে সে পাম্পেই ঘুরে আসবে আজ রাতটা কোন ক্রমে ওরা তিনজন মিলে কাটিয়ে দিক। কোন ইঁদুর বা টিকটিকিও এরকম আওয়াজের উৎস হতে পারে।
কাজের বুয়াকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে বর্ণ তাইসন কে নিয়ে বাইরে নেমে পরে। এখানকার রাস্তাঘাট সব অপরিচিত ম গুগল ম্যাপ টা অন করে নেয় ফোনে। সাথে প্রতিরক্ষার জন্য রিভালবার নেই। যেটা আছে সেটা শুধুমাত্র দৈহিক বল।গাড়ি বা বাইক দিয়ে পাম্পেই তে যাবেনা বলে ঠিক করে তাইসন। শহর থেকে ঐদিকটায় গাড়ি বা বাইক নিয়ে যেতে দেখলে ওদেরকে ফলো করতে পারে প্রশাসনের লোকজন। " বুদ্ধিটা তাইসন এর।
যাওয়ার উপায় হিসেবে বাইসাইকেল ব্যাবহারের আয়ডিয়াটা মন্দ লাগে না বর্ণের ও।
তাইসনের শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে ছোট খাট দোকান পর্যন্ত সব কিছুই পরিচিত।
সে খুব কম সময়ের মধ্যেই দুটো বাইসাইকেল ভাড়া করে ফেলে।
তারপর ছোট খাট গলি অতিক্রম করে চলে আসে শহরের শেষ প্রান্তে। এরপর ই ছাই এর নিচে ঢাকা পরা পাম্পেই নগরীর এড়িয়া শুরু।
বর্ণ এবং তাইসন দুজনের কারো ই বিন্দু মাত্রও ধারণা ছিল না আজ রাতে তাদের সাথে কি হতে যাচ্ছে। তারা যে নিখাদ মৃত্যু কূপের দিকে পা বাড়িয়েছে এ কথাটা জানতো শুধুমাত্র লিন্ডা।
হালকা বন জংগলের রাস্তা, চারপাশে কেমন পোড়া পোড়া পরিবেশ তার ভিতর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বর্ণ এবং তাইসন। গাড়িতে যেতে দু ঘন্টার পথ। সাইকেল চালিয়ে পৌঁছাতে আরো অনেক সময় লাগবে। আধাঘণ্টা একটানা সাইকেল চালিয়ে বেশ ক্লান্ত হয়ে যায় দুজনেই।সাইকেল থামিয়ে, একটু জিড়িয়ে পানি খেয়ে নেয় তারা। হঠাৎ লিন্ডার বাসার ল্যান্ড ফোন থেকে কল আসে। বর্ণ তড়িঘড়ি করে ফোন ধরতেই
কাজের বুয়ার কন্ঠ ভেসে আসে ওপাশ থেকে।
তার বলা কথাটা ছিল এমন,
" স্যার লিন্ডা আপা আজ স্বপ্নে দেখেছে,আপনারা সাইকেল চালিয়ে একটি বাসার দিকে যাচ্ছেন। সে বাসায় ঢোকার সময় আপনাদের উপর একদল লোক হামলা করে। তারা এ পৃথিবীর কেউ না। লিন্ডা আপা আপনাকে বারণ করেছে ওদিকে যেতে।
বর্ণ ফোন কেটে সুইচ অফ করে পকেটে রেখে দেয়। লিন্ডার স্বপ্নকে অবজ্ঞা করার উপায় নেই। বর্ণ সাইকেল চালাচ্ছে সেটা ও লিন্ডার জানার কথা নয়। সুতরাং বর্ণ নিজে একটা ভাল সিদ্ধান্ত নিলেও তাইসন কে কিছুই বলে না। বেশ অনেক ক্ষন সাইকেল চালানোর পরে একটা পর্যায়ে তারা পৌঁছে যায় সেই পরিত্যক্ত বাড়িটির কাছে। ঝোপঝাড় পার হয়ে একটা খোলা জায়গা। সেই খোলা জায়গার মাঝখানেই হলো বাড়িটি।বর্ণর আদেশে তাইসন ঝোপ থেকে বের হয় নি। সাইকেলগুল বনের আরো একটু ভিতরে পার্ক করে রাখে।তারপর খোলা জায়গাটার নিকটবর্তী একটা গাছে উঠে বসে পরে দুজনেই। তাইসনের মাথায় ঢুকছে না বর্ণের এমন কাজ কারবার করার উদ্দেশ্য কি হতে পারে! তাইসনের কানের কাছে মুখ নিয়ে বর্ণ ফিসফিসিয়ে বলে, এখানেই বসে অপেক্ষা করো।কিছু ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
তাইসন বিরক্ত হচ্ছে না মোটেই। একজন গোয়েন্দার সাথে থাকলে বিরক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। সব সমঅয় রহস্যে বুঁদ হয়ে থাকা যায়। তাইসন বর্ণের মতলব বুঝতে পারুক আর না পারুক মনে মনে সেও ভাবতে শুরু করেছে, কিছু একটা হয়তবা ঘটবে। এভাবে প্রায় ১ ঘন্টা পেরিয়ে যায়। তেমন কিছুই হচ্ছে না। তাইসনের ঘুম চলে এসেছে ইতিমধ্যেই। প্যান্টের পকেট থেকে একটা কাঁচের বোতল বের করে তাইসন। ঢক ঢক করে কয়েক চুমুক পানীয় খেয়ে নেয়। বর্ণের ও তেষ্টা পেয়েছিল খুব। সাথে আনা পানি সাইকেলের সাথে রেখে এসেছে। তাইসনের পান করা পানীয় থেকে বাজে একটা গন্ধ এসে বর্ণের নাকে লাগে। তাইসনের দিকে বিরক্তিভরা চোখে তাকিয়ে সাথে সাথে চাপা গলায় ধমক দেয় বর্ণ!! এই অবস্থায় তুমি ড্রিংকস করছ???
ড্রিংকস হল সময় কাটিয়ে দেয়ার ঔষধ বর্ণ সাহেব!!এই যে দেখুন, আমি এখন মাতাল হয়ে আছি, নেশার ঘোরে কি দেখতে পাচ্ছি জানো??
বর্ণঃ কি?
তাইসনঃ(ঢুলু ঢুলু ঘুম জড়ানো কন্ঠে জানায় সে দেখছে যে,)
ঐ পরিত্যক্ত বাড়িটার দরজা, কে যেন ক্যাচ ক্যাচ করে খুলে ফেলল!!
সেখান থেকে বের হয়ে এল জাকির সাহেব । সে এখন হাওয়ায় ভেসে ভেসে বাড়িটির চারদিকে ঘুরছে, ঐ যে দেখো!! আরো একটা জাকির আংকেল বের হয়ে আসলো!! হায় হায়, সাথে দেখি সাঞ্জেও আছে!! নাহ নেশাটা ভাল ই ধরেছে!! সব মৃত মানুষের আত্মা দেখতে পাচ্ছি!!
বর্ণঃ পিছনের যে ঐ ব্লু কালারের মেয়েটা ভাসছে, ওটার নাম ই কি সাঞ্জে??
তাইসনঃ কি ব্যাপার বলো তো বর্ণ? তুমি কি না খেয়েই টাল হয়ে গেলে যে তুমিও আমার মত জাকির আংকেল আর সাঞ্জে কে দেখতে পাচ্ছ??
বর্ণঃ আমি তো সাথে লিন্ডার দুজন প্রেমিক কেও দেখতে পাচ্ছি!!
তাইসন এবার চোখ ডলে দু আংগুল দিয়ে!!
সত্যি, আরো দুজন ছেলে কে দেখতে পাচ্ছে সে।এর চেয়ে দামি মদ খেয়েও তো কখনো এমন দেখে নি সে।
ব্যাপারগুলো যে সত্য সত্য ই ঘটছে সেট বুঝতে আরো বেশ কিছুক্ষন সময় লেগে যায় তাইসনের। এবং সাথে সাথেই সে প্রচন্ড ভয় পায়। মৃত জাকির সাহেব, সাঞ্জে এবং বর্ণের ভাষ্যমতে লিন্ডার দুজন প্রেমিক বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে এটা এক প্রকারের অবিশ্বাস্য বলা যায়।ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে তাইসন। হঠাৎ বাড়ির চারপাশে চক্কর কাটতে থাকা সবায়াই নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আস্তে আস্তে শব্দের উৎস খুঁজে বর্ণদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। বর্ণ ততক্ষনে তাইসনের মুখ চেপে ধরে বসে আছে।যখনই বর্ণ এবং তাইসনের খুবই কাছাকাছি পর্যায়ে চলে এসেছিল ভাসন্ত মানুষ গুলো,ঠিক তখন ই বর্ণ ও তাইসন বুঝতে পারে, শুধুমাত্র তারাই দুজন মানুষ নয়, যারা এই লোক গুলোকে দেখছে। হঠাৎ করেই চারপাশ থেকে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়িটির আঙিনায় প্রবেশ করে একদল লোক!! বর্ণের চোখ কপালে উঠে। এরা তো এমেরিকান এসাজিন সোলজার্স " ব্লাক ক্যাটস" এদের অবস্থান কোথায় কি আছে তা বিশ্বের অন্য কারো কাছে শুধুমাত্র রহস্য একটা। ইটালীয়ান সরকার সাঞ্জের চারটে মৃতদেহ পাওয়ার খবর ফেক বলে ধামাচাপা দিয়ে দিলেও এমেরিকান দের নজর এড়ায় নি তবে। ইটালিয়ান প্রতিরক্ষা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এমেরিকান ব্লাক ক্যাটস গ্যাংরা ঠিকই ইনভেস্টিগেশন চালিয়েছে, কড়া নজর রেখেছে জায়গাটার উপর। তার মানে আজ তাইসন ও বর্ণ এই ঘরটায় প্রবেশ করলে হয়ত ব্লাক ক্যাটসের ভারী অস্ত্রের আক্রমে ঝাঝড়া হয়ে যেত নইলে এই অদ্ভুত ঘুরতে থাকা আত্মাদের হাতে ধরা পড়ত।
ভাসতে থাকা জাকির সাহেব,সাঞ্জে এবং বাকি লিন্ডার দুজন বয়ফ্রেন্ড এর চোখ পরে ব্লাক ক্যাটস গ্যাং এর উপরে। তারা ধীরে ধীরে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যায় সেদিকে।এদিকে ব্লাক ক্যাটস এর একজন ইংলিশে কমান্ড করে তাদের উদ্দেশ্যে, তারা যেখানে আছে সেখানেই যেন থেমে যায়।আরো জানায়, তাদের সাথে শান্তিপূর্ণ কমিউনিকেশন করার ইচ্ছা রয়েছে তাদের।
হাওয়ায় ভাসতে থাকা লোক গুলোর ভিতর থেকে একজন উত্তর কিছু একটা বলে উত্তর দেয়। একটু পর সেটা ইংরেজীতে ট্রান্সলেট হয়ে সবার কানে ভেসে আসে। যেটায় বলা হয়,তারা তাদের পরিচয় দিতে কিংবা কারো সাথে কমিউনিকেশন করতে আগ্রহী নয়। তাদের কাজ শেষ হলে তারা সেচ্ছায় চলে যাবে।
ব্লাক ক্যাটস এর একজন তাদের আচরণ ও কথা শুনে এলিয়েন মনে করে বসে এবং জাকির সাহেবের চেহারার মানুষটি সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় তার দিকে তাক করে গুলি ছুঁড়ে।
ব্লাক ক্যাটসের উদ্দেশ্য ছিল তাদের বাহন এবং তাদের শরীর নিয়ে গবেষনা করে উন্নত প্রযুক্তি এমেরিকার করায়ত্ত করে নেয়া।সেটা কাউকে খুন করে হলেও। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে বুলেট ভাসমান লোকটির গায়ে না ঢুকে তার সামনে এসে হঠাৎ থেমে যায়। পেছন থেকে একজন বলে উঠে, ইটস সো ডেঞ্জেরাস!!
মুখে বাঁকা একটা হাসি দেয় জাকির সাহেবের চেহারার লোকটা। এ হাসিটা তাচ্ছিল্যের হাসি।
যে লোকটা প্রথম তাদের উদ্দেশ্যে গুলি ছুড়েছিল তার দেহটা সাথে সাথে কয়েকটা টুকরা হয়ে গিয়ে শূন্যে ভাসতে থাকে। বড় বিভৎস সে দৃশ্য। রক্ত নাড়িভুঁড়ি গুল বাতাসে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে। ব্লাক ক্যাটসের বাকি লোক গুল বুঝতে পারে তারা খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু তারা কমিটেড। মৃত্যু নিশ্চিত হলেও মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধ করার জন্য।
তাদের সব অস্ত্র নিয়ে ফায়ারিং শুরু করে মুষলধারে। কিন্তু সব কিছুই বৃথা। একের পর এক সোলজারের দেহ টুকরো টুকরো হয়ে শূন্যে ভাসতে শুরু করে । কিন্তু হঠাৎ ভাসতে থাকা লোকগুলোর ভিতরে একজন বাধা দিয়ে বসে। লিন্ডার এক প্রায়াত বয়ফ্রেন্ড। সে অন্যদের বুঝাতে চেষ্টা করে, বুলেটে যেহেতু তাদের কোন ক্ষতি হচ্ছে না, সুতরাং এভাবে মানুষদের কে খুন করে লাভ কি!! এ কথা শোনার পরে জাকির সাহেবের মত দেখতে লোকটা ভীষন ক্ষিপ্ত হয়ে যান। তিনি লিন্ডার বয়ফ্রেন্ডের চেহারার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে উচ্চারণ করেন।
.
.
সাথে সাথে ছেলেটির দেহ ও কয়েকটুকরোয় পরিণত হয়ে যায় এবং ব্লাক ক্যাটসদের মৃতদেহের সাথে ভাসতে শুরু করে। এদিকে গোলাগুলির শব্দ শুনে ইটালীয় প্রশাসনের টনক নড়ে। তারা শব্দ অনুসরণ করে যেট প্লেন এবং হেলিকপ্টার নিয়ে জায়গাটার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
বিষয়টা টের পেয়ে যায় অদ্ভুত লোকগুলি। একজনের হাতের তুড়িতে শূন্যে, ব্লাক হোলের মত একটা গোলাকার গর্ত তৈরি হয়। যার ওপাশে শুধুই অন্ধকার।
ব্লাক ক্যাটসের সব অস্ত্র বুলেটসহ টুকরো টুকরো হওয়া দেহ গুল সেই সাথে নিজেদের দলের একজনের মৃতদেহ নিয়ে সবাই সেই ব্লাক হোলের ভিতরে ঢুকে যায়। পরে মুখটি নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে আসে।
চারদিকে সেই আগের মতই আবার শুনশান নিরবতা। বর্ণ ভালই বুঝে এখন কি করতে হবে তাইসন কে নিয়ে লাফ দিয়ে গাছ থেকে নিচে নামে। যতটা দ্রুত পারে সাঁই সাঁই করে সাইকেল চালাতে থাকে বন জংগলের ভিতর থেকে। ইটালীয় সেনাবাহিনী বা পুলিশরা এই এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজবে। উপরে হেলিকাপ্টর সার্চ লাইট জ্বালিয়ে মহড়া দিচ্ছে। সাইকেলের সামনে লাগানো ব্যাটারির হেড লাইট জ্বালানো যাবেনা। চাঁদের আলো খুব ক্ষীন, বেশ ঝামেলার মধ্যেও দ্রুত গতিতে সাইকেল চালিয়ে ছুটে চলেছে এমন দুজন লোক, যারা আজ একটু আগেও এমন কিছু দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী ছিল, যা পৃথিবীর এক অনন্য ইতিহাস হয়ে রইবে চিরকাল।
বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয় দুজনেই।তখন প্রায় ভোর। কাজের বুয়া খাবার দেয় তাদের খাবার খেয়ে দুজনেই সোফায় গা এলিয়ে দেয়। ক্লান্ত হলেও ঘুম আসছে না তাদের।
বর্ণের মাথায় চিন্তা একটাই, ইটালীর প্রতিরক্ষার চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও এদেশে থাকা এমেরিকান স্পাই সোলজার্স, ব্লাক ক্যাটসদের চোখ কিভাবে ফাঁকি দিবে সে!! এমনও হতে পারে তাদের গাছে চড়া সহ সব কিছুই ব্লাক ক্যাটসের কোন সদস্য দেখে ফেলেছে, বাসা পর্যন্ত ফলো ও করে এসেছে!! অসম্ভব নয় কিছুই!! ছায়ার চেয়েও বেশি অস্পৃশ্য ওরা। একটা সাইলেন্ট যুদ্ধ ঘোষনা হয়ে গেল আজ থেকে, ব্লাক ক্যাটস আর বর্ণের মাঝে।দুজনের উদ্দেশ্য এক হলেও একে অপরের শত্রু এরা। এমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য অন্য দেশে এসে তাদের অস্ত্র দিয়ে হামলা চালাবে সেটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায়না।
সব কিছুর মাঝেও লিন্ডার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটাও ভুলে নি বর্ণ।
লিন্ডা ঘুমাচ্ছে তার রুমে। বর্ণ পা টিপে টিপে লিন্ডার রুমে প্রবেশ করে। বিছানার পাশের টেবিলে একটা ডায়েরী রাখা। ডায়েরী টার প্রথম পৃষ্ঠা উল্টাতেই আবারো বির্ণ রহস্যের চোরাবালি তে আটকে যায়।
সেখানে কিছু সংকেত আঁকা ছিল। অনেকটা এ রকম;
♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦ ♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦ ♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦
.
.
উপরের সংকেত গুলো দেখে থ হয়ে যায় বর্ণ। এটা নিয়ে সে নিজেও রিসার্চ করেছে। জিওম্যান্সি ফিগারের নকশা। যা দ্বারা হিসেব করে ভবিষ্যৎ বলা যায়।অনেক খুজেও বর্ণ শুধু ২ টা নকশা পেয়েছিল। লিন্ডার ডায়েরী তে সব গুলো নকশা আছে হয়ত। জিওম্যান্সি বিদ্যা সম্পর্কে তাহলে লিন্ডার আয়ডিয়া আছে। এজন্যই সে স্বপ্নে ভবিষ্যৎ দেখতে পায়।
জিওম্যান্সির সাহায্যে গণনা করা যিশু বা হযরত ঈসা (আ) ও জানতেন।ইহুদি আলেমগণ একজন বেশ্যাকে ঈসার নিকট শরীয়তী বিচারের জন্যে নিয়ে এলে তিনি এ্ই জিওম্যান্সির সাহায়্যে দ্রুত বের করে ফেলেন উপস্থিত ইহুদি আলেমগণের কার কার সাথে কোন কোন মহিলার অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। আর তিনি সংশ্লিষ্ট আলেমের নামের সাথে ঐ স্ত্রীলোকের নাম যুক্ত করে দ্রুত মাটিতে তা লিখে ফেলেন যা দেখতে পেয়ে আলেমগণ ঐ নারীকে ফেলে একে একে সেখান থেকে সঁটকে পড়েন।
অপর পৃষ্ঠা উল্টানোর আগেই ঘুম ভেংগে যায় লিন্ডার। বর্ণ চুপচাপ ডায়েরী টা আগের জায়গায় রেখে দেয়। বিষয়টা লিন্ডার চোখ এড়ায় নি। অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে বর্ণর দিকে তাকায় সে।
_________
চলবে...
[ পর্ব ১+২+৩]
- " আমি যাকেই বয়ফ্রেন্ড বানাই না কেন, কিছুদিন পরে সে সুইসাইড করে মারা যাবেই।আমি নিজেকে এখন অভিশপ্ত একজন মেয়ে মনে করছি। এ ব্যাপারে তোমার কাছে কোন সল্যিউশন হবে?"
- " আপনার নাম?"
- "লিন্ডা।"
বর্ণ : আপনার প্রেমে পরে এখন পর্যন্ত কতজন সুইসাইড করেছে?
.
লিন্ডা: টুয়েলভ।
.
বর্ণ: আপনার এতগুলো বয়ফ্রেন্ড থাকা এবং তাদের সুইসাইডের ঘটনা দুটোই অস্বাভাবিক লাগছে। তবে সুইসাইড এর ব্যাপারটা কাকতালীয়ভাবে হতেই পারে। এ পৃথিবীতে অনেক অস্বাভাবিক ঘটনা স্বাভাবিক ভাবেই ঘটে যায়।
.
লিন্ডা: "সেটা অসম্ভব বর্ণ। দেখো, তুমি আমাকে পাগল ভেব না। ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস। কেউ ই চায় না এই হাজার মানুষের মাঝে নিজের কপালে একজন অভিশপ্ত মানুষের ট্যাগ লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে।আমার ই বা কি হবে? সারাজীবন কি একা একা ই থাকব? আংকেল বলেছিলো তুমি ভালো একজন গোয়েন্দা। তাই তোমার কাছে কোন সলিউশন পাই কিনা সে জন্য এসেছি।"বিশ্বাস করো আমাকে,আমার জীবন ও ঝুঁকিপূর্ণতার মধ্যে কাটছে।
.
বর্ণ : আপনি কিভাবে শিওর হলেন যে এটা কোন কাকতালীয় ঘটনা না?
.
লিন্ডা: তাদের সুইসাইড নোট।
বর্ণ: আপনি দেখেছিলেন সব গুলো??
.
লিন্ডা: হ্যাঁ দেখেছি।সব গুলো না হলেও বেশ কিছু দেখেছি। এমনকি এ সুইসাইড নোট গুল ইটালীয়ান পুলিশ দের ও মাথা খেয়েছে। সব গুলো সুইসাইড নোটে একটা অদ্ভুত ধাঁধা লেখা ছিলো। ভাগ্য ভাল এসব সুইসাইডের ঘটনা নিউজপেপারে বা মিডিয়ায় আসে না। তাহলে উলটো সবার সাথে আমার সম্পৃক্তা থাকার কারণে আমাকেই সিরিয়াল কিলার ভেবে আটক করা হত। এখনো পর্যন্ত এই ১২ জনের মৃত্যু যে আমার দ্বারা লিংকড আপ সেটা গোপন আছে। এমনকি পুলিশের কাছে সুইসাইড নোট গুলর একে অপরটার সাথে মিলে যাওয়ার তথ্যটিও তারা পায় নি।
.
বর্ণ : তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন একই শহরে আপনার দুজন প্রেমিক ছিল না। রাইট?
.
লিন্ডা: এক্সাক্টলি। ইটালীর সেম শহরে আমার একটার বেশি বয়ফ্রেন্ড ছিল না।
তুমি চাইলে আমি তোমাকে কিছু সুইসাইড নোট এর ছবি দেখাতে পারি। আর হা, আমি বয়সে তোমার বড় হব না।আমাকে তুমি করে বললেই আমি বেটার ফিল করব।
.
বর্ণ: শিওর।
.
লিন্ডা গ্যালারি থেকে ফোন বের করে কিছু ছবি স্লাইড করে। বর্ণ সেখানে আত্মহত্যা করা প্রেমিক দের সুইসাইড নোটের ছবি দেখতে পায়। কিন্তু সেখানে শেষ লাইনটাই শুধু এলফাবেটিক। বাকি লাইন গুলতে বেশ কিছু নম্বর এলোমেলো ভাবে সজ্জিত রয়েছে।
অদ্ভুত ভাবে ৬ টা সুইসাইড নোটের লেখাই এক।মাত্র ছয়টি ছবি ই লিন্ডা সংগ্রহ করতে পেরেছিল।বাকিগুলোতেও এরকম লেখা ছিল বলে তার ধারণা।ছয়টি
সুইসাইড নোটেই লেখা ছিল,
1,2,4,7
1,5,5,4,4,
3,3,6,2
It's pleasant to die.
ছবিগুলো দেখে কপালে মৃদ্যু ঘাম চলে আসে বর্ণের।
ইটালী এসে এরকম একটা রহস্যের সন্ধান পাবে বুঝতে পারে নি সে।
রহস্যের সমাধান দিতে পারবে কিনা সেটা সম্পর্কে বর্ণ নিশ্চিত নয়। তবে বর্ণ আগ্রহী, ভেতরকার রহস্যটুকু জানার জন্য। নিজ থেকেই সে লিন্ডাকে উদ্দেশ্যে করে বলে,
মাত্র কাল ই ইটালী পৌঁছালাম। তুমি চাইলে থাকলে আমাকে নিয়ে কফি খেতে যেতে পারো। বাকিটা গল্প করতে করতে জেনে নিব।
লিন্ডা: তুমি ইটালী আসবে শুনেছিলাম আরো চার দিন আগেই। জহির আংকেলের কাছে তোমার অনেক গল্প শুনেছি। তুরাণ, তুমি আর জহির আংকেল মিলে নাকি অনেক বড় বড় কেস সলভড করেছ। মূলত আংকেল ফোনে আমার কাছে এমন ভাবে তোমার কথা উপস্থাপন করেছেন যে আমি তোমার ব্যাপারে নির্ভরতা পেয়েছি, সেদিন ই সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমার সাথে আমার এই গোপনীয় ব্যাপারটা শেয়ার করব। নিজের ভিতরে এত্ত বড় একটা সিক্রেট চেপে রাখতেও আমার কষ্ট হচ্ছিল। খুব ডিপ্রেশনে থাকতাম ব্যাপারটা নিয়ে।
.
বর্ণ: তুমি জানো না লিন্ডা, জহির আংকেল ভয়ানক চাপাবাজ, আমার ব্যাপারে নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলেছেন।
.
লিন্ডা: আচ্ছা তা বলুক। তাও তোমার সাথে কথাটা শেয়ার করে আমার ভালো লাগছে । দেখো কোন কূল কিনারা পাও কিনা। আমি এখন আসি। বিকেলে আবার আসব। কফি খেতে বের হয়ে গল্প করা যাবে আরো। রেডী থেকো।
বর্ণ : বেশ!
লিন্ডা বর্ণের ফেসবুক আইডি সংগ্রহ করে তখনকার মত প্রস্থান করে।
লিন্ডা যাওয়ার পরেই সাথে সাথে নোটবুক বের করে বর্ণ,
কিছু কিছু ব্যাপার নোট করে রাখা জরুরী। ধরা যাক লিন্ডার সব কথা সত্যি ,ওর কথাগুল বিশ্লেষণ করলে কিছু ব্যাপারে খটকা লেগে যায় ,
তা হল নম্বরের ব্যাপার টা, নম্বর গুলো যে একটা ধাঁধাঁ সেটা লিন্ডা কিভাবে বুঝলো!!
র্যানডমলি কোন লেখাও তো হতে পারে। তার মানে লিন্ডা জানে বা আন্দাজ করেছে নম্বরগুলতে হয়তো লুকানো কোন তথ্য রয়েছে। আবার একই শহরে লিন্ডার দু জন বয়ফ্রেন্ড ছিল না। এটাকে কি কাকতালীয় বলা যায়? নাকি ওয়েল প্লানড!
লিন্ডার দ্বারা যদি সুইসাইড গুলো প্রভাবিত হয়ে থাকে, তবে সে নিজেই এই রহস্যের সমাধান খুঁজবে কেনো!
ছোট খাট গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট গুল নোট করে রাখে বর্ণ।
এর মাঝেই রুমে প্রবেশ করেন মি. জাকির। খুবই গুরু গম্ভীর একজন মানুষ। জহির আংকেলের আপন ভাই হলেও তার কথাবার্তার ধরণ এবং বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দুটোতেই আকাশ পাতাল পার্থক্য।যদিও মধ্যবিত্ত জহির আংকেলকেই বর্ণের বেশি পছন্দ। জহির আংকেল কে আংকেল ডাকার সুবাদে মি. জাকির হোসেন কে শুরু থেকেই আংকেল বলে ডেকে আসছে বর্ণ। লিন্ডা তার ই একমাত্র মেয়ে।
এখানে থাকতে কোন প্রকার অসুবিধে হচ্ছে কিনা খোঁজ নেয়ার জন্য ই জাকির হোসেন উপস্থিত হয়েছেন, তিনি পেশায় সাংবাদিক। মূলত তার একটা আর্টিকেল পড়েই বর্ণ এখানে উপস্থিত হয়েছে।কিন্তু সেটা জাকির সাহেব নিজেও জানেন না। তার অফিসের গেস্ট রুমেই বর্ণের থাকার ব্যাবস্থা হয়েছে।
অবশ্য গেস্ট রুম টা অফিসের মূল কক্ষ থেকে সম্পূর্ন আলাদা। অফিস বন্ধ থাকলেও দিন রাত ২৪ ঘন্টাই গেস্ট রুম থেকে বাইরে যাওয়া আসা করা যায়।
জাকির হোসেন এসেই দেশের গল্প জুড়ে দিলেন।ছোট ভাই জহিরের খবর নিলেন।দীর্ঘ ২২ বছর এই ইটালীতেই পরে আছেন তিনি। দেশে যাওয়া হয়নি তার। সর্বশেষ দেশ থেকে বিয়ে করার পরে বৌ নিয়ে চলে এসেছিলেন ।
তার দেড় বছর পরেই লিন্ডার জন্ম। জহির আংকেলের কথা উঠিয়ে আফসোস করলেন জাকির সাহেব ।তিনি অনেক বার ইটালী নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন ছোট ভাই জহির কে। কিন্তু তিনি দেশের মাটি ছাড়তে চান না।
খোঁজ খবর নেয়ার পালা শেষ হলে জাকির হোসেন বর্ণকে সাময়িক বিদায় জানান। যাওয়ার আগে বলে যান, যে কোন প্রয়োজনে তাকে জানানোর জন্য এবং যতদিন খুশি ইটালীতে অবস্থান করার জন্য।অবশ্য জাকির হোসেন কথায় কথায় বার বার জানার চেস্টা করছিলেন হঠাৎ ইটালীতেই কেন আসলো বর্ণ, তার চোখে মুখে কেমন যেন একটা উৎকন্ঠা কাজ করছিল সব সময়। বর্ণের গোয়েন্দাগিরির কথা জাকির হোসেনের অজানা নয়। তার এই অজ্ঞাত উৎকন্ঠার কারণ নিয়ে ভাবার ফুসরৎ নেই বর্ণের। আপাতত একটা বিষয় নিয়েই মাথা ঘামানো যাক। ওহ হো!! ভুল হলো,আপাতত দুটো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো যাক।
.
লিন্ডার ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করার পর নিজ থেকেই বর্ণকে নক করলো সে। জানালো আজ সকালে বাসায় গিয়ে ঘুম দিয়েছিল লিন্ডা,ঠিক তখনই ঘুমের মাঝে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে সে।
বর্ণ স্বপ্নের গল্প গুজব শুনতে আগ্রহী নয়। তবুও লিন্ডা যখন বলল, স্বপ্নটা তোমকে ঘিরে দেখা হয়েছে বর্ণ।
স্বাভাবিক ভাবেই তখন বর্ণ জানতে চাইলো,
"কেমন ছিলো তোমার স্বপ্ন?
লিন্ডা বলতে শুরু করলো... আমি দেখলাম
" ল্যান্ডফোন এ রিং হচ্ছে। একটা মেয়ে ঘড়িতে দেখলো তখন রাত প্রায় ১১:১৫ বাজে। তার গায়ে তখনও পড়া ছিলো ব্লু ইউনিফর্ম, পিজা ডেলিভারি দেয়াটা ছিল তার জব। ১১ টায় শপ বন্ধ হয়ে গেলেও গুছিয়ে নিতে নিতে ১১:১৫ বেজে যায় । ঠিক তখন ই পিজা ডেলিভারী চেয়ে একটা কল আসে ।
বিরক্ত সহকারে মেয়েটা ফোন পিক করে। ৭ টা পিজা ডেলিভারি নেয়ার জন্য কেউ একজন ফোন করেছে। প্রথমে ডেলিভারি দিতে পারবে না বলে ফোন রেখে দিলেও ওপাশ থেকে প্রতি পিজার জন্য ২০% এক্সট্রা পে মেন্ট দিবে বলে অফার করায় রাজি হয় মেয়েটি।
গাড়ি নিয়ে রওনা দেয় লোকেশন অনুযায়ী।
কিন্তু জায়গাটা ছিল অনেক দূরে।শহর থেকে বের হয়েও ৪ কিলোমিটার ড্রাইভ করতে হয় মেয়েটির। অবশেষে ঝোপ ঝাড়ের মধ্য দিয়ে উপস্থিত হয় একটা পুরানো গোছের দ্বীতল ভবনের বাড়ির সামনে।
শিশ বাজাতে বাজাতে পিজার প্যাকেট গুলো গাড়ির ব্যাক সিট থেকে নামায় মেয়েটি। দরজার সামনে গিয়ে দেখে স্ক্রাচ করা দরজার গায়ে।পুরোনো কাঠের দরজা। কোন কলিংবেল নেই। বাধ্য হয়ে দরজার উপর আংগুল দিয়ে নক করে মেয়েটি। ঠক ঠক ঠক...
ওপাশে শুনশান নিরবতা। কোন সাড়া শব্দ নেই। কিছুক্ষন পরে সে গলা ছেড়ে ডাক দেয়,
Hello, your pizza is here.....
সে ডাক প্রতিধ্বনি হয়ে মেয়েটার কানে ফিরে আসে।
অনেকটা উইয়ার্ড সিচুয়েশন এ পরে সে।
সিদ্ধান্ত নেয় পিজা গুলো নিয়ে দোকানে ফিরে যাবে। পরিবেশ ভাল লাগছে না তার।
ঠিক এমন সময়, দরজার ওপাশ থেকে ঠক ঠক ঠক করে তিনটি নক হয়। আকাশ থেকে পরে মেয়েটি। দরজার ভিতর থেকে কেন কেউ নক করতে যাবে??
দরজার সামনে গিয়ে আবার দাঁড়ায় সে। হঠাৎ তার চোখ চলে যায় দরজার পাশে থাকা জানালার দিকে। সেদিকে তাকানোর সাথে সাথেই সে প্রচন্ড ভয় পায়। মনে হচ্ছে শত শত মানুষের চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। কোন মাথা দেখা যাচ্ছে না। শুধু সাদা সাদা অনেক গুল চোখ পলক ফেলছে তার দিকে তাকিয়ে। সাথে সাথে 911 এ ফোন করে মেয়েটি। পুলিশ লোকেশন ট্রাক করে সেখানে পৌঁছে যায়। কিন্তু ততক্ষনে বেশ দেড়ি হয়ে গিয়েছে। পিজার ডেলিভারি দিতে নেয়া গাড়িটি পাওয়া যায় সেই বাসার দ্বিতীয় তলায়। গাড়িটির ভিতরে পরে চারটি লাশ। কিন্তু অবাক করা বিষয় গাড়ির সামনের সিটের লাশ দুটি এবং পেছনের সিটের লাশ দুটির চেহারা এবং জামা কাপড় একই রকম ছিল। সব শেষে আমি দেখতে পাই এ রহস্যটা সমাধান করার জন্য তুমি ইটালীতে এসেছো। এর পরেই আমার ঘুম ভেংগে যায়।
.
.
যেন আকাশ থেকে পরে বর্ণ। মি. জাকির সাহেব কয়েকদিন আগেই এই ঘটনা নিয়ে একটা আর্টিকেল লিখেন। তবে এত বিস্তারিত না। সাঞ্জে নামের একটা মেয়ে ডিউটি টাইম শেষ হওয়ার পর ও পিজা ডেলিভারি দিতে গিয়ে কোন এক সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং পুলিশকে ইনফর্ম করে।
পুলিশ সেখানে গিয়ে উপস্থিত হওয়ার পর, সাঞ্জে কে না পেয়ে পুরো বাড়িটায় তল্লাশি চালায়।বাড়িটির দোতলায় তারা ডেলিভারি দেয়ার জন্য নিয়ে আসা গাড়িটি খুঁজে পায় এবং প্রতিটি সিটে একটা করে মৃত সাঞ্জেকে দেখতে পায়। পুরো পৃথিবীব্যাপি রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায় খবরটি। কিন্তু অনেকেই এটাকে ফেক ভেবে উড়িয়ে দেয়। জহির আংকেলের কাছ থেকে বর্ণ প্রথম এ ঘটনাটা জানতে পারে। খুব অল্প সময়ে একটা গাড়িকে না ভেংগে চুরে পুরানো ঘরের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠানো আবার সেখানে একই ব্যক্তির চারটে লাশ পাওয়া টা কল্পনার ও বাইরে। এটা নিয়ে সিক্রেট গবেষনা চালানোর জন্য ইটালীর সরকার নিজেই এই তথ্যকে ভুয়া বলে সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ কনফিডেন্সিয়াল তথ্য শুধুমাত্র ইটালীর বড় বড় সাংবাদিক এবং প্রশাসনের লোকদের ভিতরে সীমাবদ্ধ ছিল। সাংবাদিক যারা এ ঘটনার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত তাদের ভিতরে জাকির হোসেন অন্যতম।
কিন্তু বর্ণ এ ব্যাপারটা নিয়ে ইনভেস্টিগেট করতে এসেছে এটা বাইরের কেউ জানতে পারলে বর্ণের আর ইটালীতে থাকা হবেনা। তাই সে নিজের ভিতরে বিষয়টি চেপে রেখে চুপি চুপি কাজ সারতে চেয়েছিল।
কিন্তু লিন্ডা? সে স্বপ্নে এতটা বিস্তারিত ঘটনা এবং বর্ণের ইনভেস্টিগেশন এর ব্যাপারে সব দেখে ফেলল কিভাবে!! মাথা ব্লাংক হয়ে আসে বর্ণর।
লিন্ডাকে সে সেদিন বিকেলে আসতে নিষেধ করে। কাজে ব্যস্ত থাকার নাম করে একটা ঘটনার সাথে অন্য ঘটনার মিল খোঁজার চেষ্টা করতে থাকে।এ যেন এক অদ্ভুত দুনিয়ায় বসবাস করছে বর্ণ। এত বড় রহস্য সমাধান করার কথা কল্পনাও করতে পারছে না সে। শুধু মাত্র রহস্যটা কি সেটা জানার জন্য ঘাটাঘাটি করার প্রচন্ড ইচ্ছে তার ভিতর কাজ করতে থাকে।
রাতে সামান্য কিছু খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় বর্ণ। ইটালীর এই ছোট্ট শহর নেপলস থেকে একটু দূরে অবস্থিত প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত পাম্পেই নগরী হয়ত বর্ণের জন্য এক বুক রহস্য ধারণ করে আছে।চারজন সাঞ্জের লাশ পাওয়া গিয়েছল পাম্পেই নাগরীর এক পরিত্যক্ত বাড়িতে। এই পাম্পেই কে আগেই অভিশপ্তদের শহর বলে মানা হত।
৭৯ খ্রিস্টাব্দে ভিসুভিয়াস পর্বতের আগ্নেয়গিরির ২ দিনব্যাপী চলা ভয়াবহ অগ্নুৎপাতে পম্পেই নগরী সম্পূর্ণভাবে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। তখন এ নগরীটি ৬০ ফুট উঁচু ছাই এবং ঝামাপাথরের নিচে শহরটি চাপা পড়ে যায়। কারলো দি বোরবোনে-এর আর্থিক সহায়তায় শহরটি ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় মাটির নিচ থেকে আলোতে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু এখনো সেখানে কোন প্রকার জনবসতি গড়ে উঠে নি। তবে ঐ পরিত্যক্ত ঘরে কাদের বসবাস ছিল? এসব ভাবতে ভাবতে রাত ক্রমশ গভীর হয়ে আসে। লাইট অফ করে বর্ণ ঘুমাতে চেষ্টা করে একটু।রাত প্রায় তিনটা।
মনে মনে চিন্তা করে রহস্যের জালটাকে ছিড়তে হলে প্রথমে কোথা দিয়ে শুরু করা যায়!! এজন্য তাকে জাকির আংকেলের সাহায্য নিতে হবে। একটা অস্থায়ী জার্নালিস্ট এর আইডি কার্ড করে নিলে যে কোন জায়গায় যাওয়ার অনুমতি পেতে তেমন অসুবিধে হবে না।তুরাণ কে এই সময়ে খুব মিস করছে বর্ণ। জহির আংকেল এখানে থাকলে আরো ভাল হত। তিনজন আলাপ আলোচনা করতে করতে ঠিক একটা উপায় বের হয়ে আসত।
হঠাৎ বর্ণ তার জানালার কাঁচে ধুম ধাম আওয়াজ শুনতে পায়। কেউ যেন কিল ঘুষি মারছে। ৭ তলা উঁচু এই বিল্ডিং এর জানালায় বাইরে থেকে এমন কিল ঘুষির আওয়াজ এ হতচকিত হয়ে লাফ দিয়ে উঠে বসে সে। দৌড়ে জানালার কাছে যায় সে। রুমের লাইট অফ। বাইরে তখন রোডলাইটের আলো। মৃদু আলোতে থাই গ্লাসের বাইরে দাঁড়ানো সেই জাকির আংকেলের ভয়ার্ত মুখ টা দেখতে পায় বর্ণ। কিন্তু সে বর্ণের জানালার সামনে বাতাসে ভেসে দাঁড়িয়ে আছে। বর্ণ তাড়াতাড়ি করে জানালা খুলে বাইরে তাকায়, এক ঝাপটা হাওয়া প্রবেশ করে রুমের ভিতরে। বাইরে আর কিছুই নেই। কিন্তু জানালার কাঁচে যেটা আছে সেটা বর্ণের হৃদপিন্ড কাঁপিয়ে দিতে যথেষ্ট।
জানালার কাঁচে জমা ধুলোর উপরে আঙুল ঘুরিয়ে লেখা হয়েছে,
1,2,4,7
1,5,5,4,4,
3,3,6,2
It's pleasant to die.
জানালার থাই গ্লাসে লেখাটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে বর্ণ। কি হল এটা? মাথায় কিছু খেলছে না তার।
এমন সময় বর্ণের ফোনে একটা কল আসে, জাকির আংকেলের ফোন থেকে...
কম্পিত হাতে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে লিন্ডার গগন বিদারী চিৎকার ভেসে আসে। ওর বাবা, জাকির হোসেন মিনিট দুয়েক আগেই নিজের গলায় নিজে বেশ কয়েকবার এলোপাথাড়িভাবে ছুড়ি চালিয়ে সুইসাইড করেছেন।.....
নিজের গলায় নিজেই বারবার ছুড়ি চালিয়ে আত্মহত্যা, ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। সাইকোলজিক্যাল ভাবে ব্যখ্যা করলে এক ব্যক্তি কিছুতেই গলার ভিতরে একবারের বেশি ছুড়ি চালনা করবে না। একটু আগে সপ্তম তলার জানালার ওপাশে ভাসমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন জাকির আংকেল। আংগুল ঘুড়িয়ে কাঁচের উপরে লিখেছিলেন সেই দুর্বোধ্য সংখ্যাগুচ্ছ। পাম্পেই নগরীর সেই পরিত্যক্ত বাড়ি, লিন্ডা, সাঞ্জে এরা সবাই কি একই সূত্রে গাঁথা!! ভাবতে ভাবতে বাকি রাতটুকু না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিল বর্ণ। পরদিন সকালে বর্ণের গেস্ট রুমে কিছু অপরিচিত লোকজন আসে। লোক গুলো এসে বর্ণকে-জামা কাপড় সহ ব্যাবহার্য যা যা জিনিসপত্র আছে তা সব কিছু গুছিয়ে নিতে বলে।লিন্ডা লোক পাঠিয়েছে বর্ণকে তাদের নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।
রেডি হতে বেশ কিছুক্ষন লেগে যায় বর্ণর। গত রাতে কাঁচের উপরে লেখা সংখ্যাধাঁধাগুলো এখনো স্পষ্ট। মোবাইল ফোন বের করে লেখাটির কিছু ছবি তুলে নেয় সে। পরবর্তী তে কাজে লেগে যেতে পারে।
লিন্ডার বাসায় পৌঁছাতে বেশি সময় লাগে নি। পুলিশ সকালেই জাকির সাহেবের রুমটা তালাবদ্ধ করে লাশ নিয়ে গিয়েছে পোস্ট মর্টেম এর জন্য।
লিন্ডার অবস্থা ও শোচনীয়। এত বড় ধাক্কা সামলাতে পারে নি। চিৎকার করে কাঁদছে এখনো। বর্ণকে দেখার পর যেন তার কষ্ট আরো কিছুটা বেড়ে গেল। লিন্ডা কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল বর্ণকে। কিন্তু কান্নায় বার বার জড়িয়ে আসছিল তার কন্ঠ।লিন্ডার কথা গুলো গোঙ্গানির আওয়াজে রূপান্তর হয়ে যাচ্ছিল। লিন্ডাকে সান্তনা দেয়ার মত ভাষা বর্ণের নেই।সে ব্যাগ থেকে এটিভেন নামের একটা ট্যাবলেট বের করে গ্লাসের পানিতে গুলিয়ে দেয়।এটি একটি হাই পাওয়ারফুল ঘুমের ঔষধ। লিন্ডাকে সুস্থ ও সাবলীল রাখতে হলে এখন ওর কান্না থামাতে হবে। সুতরাং ৮/৯ ঘন্টার জন্য ঘুম পাড়িয়ে দেয়ার আয়ডিয়াটা যথাযথ বলেই মনে হচ্ছিলো বর্ণের কাছে।ঔষধটার স্বাদ নরমাল। পানিতে গোলালেও তাই স্বাদের কোন পরিবর্তন আসে না। বর্ণ পানির গ্লাস হাতে লিন্ডার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। লিন্ডা তখন বালিশ চাপা দিয়ে কান্না করছিল।চোখ গুলো ফুলে লাল হয়ে আছে। সর্দি আর চোখের পানি মিলে পুরো চেহারাটার বিশ্রি একটা অবস্থা হয়ে ছিল। একটা টাওয়েল নিয়ে বর্ণ লিন্ডার চোখ মুখ মুছে দেয়। লিন্ডার বয়স যখন মাত্র ১২ তখন তার মা হঠাৎ করেই এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। এরপর মা এবং বাবার আদর দুটোই পেতো জাকির সাহেবের কাছ থেকে। আজ সেই শেষ অবলম্বন টুকুও হারিয়ে ফেলল লিন্ডা।ওর জায়গায় যে কেউ হলেই প্রচন্ড ভেংগে পড়ত। পানির গ্লাসটা লিন্ডার মুখের সামনে ধরে বর্ণ। চোখ মেলে একবার বর্ণের দিকে তাকিয়ে মাথা এপাশ ওপাশ ঝাকায়, পানি খেতে অস্বীকৃতি জানায় সে।
কাল রাতের এবং আজকের ঘটনায় বর্ণের মানষিক অবস্থাও খুব একটা স্টাবল ছিল না। সে একটু জোর করেই লিন্ডাকে অন্তত পানি টুকু খাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। সাথে এটাও বলে, আমি আছি তোম সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। যদিও বর্ণ নিজেই খেয়াল করছিল, পানির গ্লাস ধরা অবস্থায় তার হাত কাঁপছে। লিন্ডার মুখের সামনে ধরতেই একটু চুমুক দিয়ে অল্প কিছু পানি খেয়ে নেয় সে। পরে নিজেই বর্ণের হাত থেকে গ্লাস নিয়ে ঢক ঢক করর পুরো পানিটা খেয়ে ফেলে। কাল রাতের ঘটনার পর থেকে ভয়,দু:খে গলা শুকিয়ে আসলেও হয়ত একটু দানাপানি ও ছোয় নি মেয়েটা। কিছুক্ষনের ভিতরে ঘুমিয়ে পরবে মেয়েটা ভেবে গ্লাস হাতে উঠে চলে আসে বর্ণ। বাইরে প্রচন্ড ভীড়। সাংবাদিক এবং সিকিউরিটি গার্ড দের। তারা ভীড় ঠেলে বাসার ভিতরে ঢুকে লিন্ডার সাক্ষাতকার নেয়ার জন্য আগ্রহী। যে চ্যানেল সবার আগে লিন্ডার সাক্ষাতকার নিতে পারবে সে চ্যানেল ই যেন সব থেকে বেশি হিট হবে, এমন একটা ধারণা বিরাজ করছে জার্নালিস্ট দের মধ্যে। শত হলেও রহস্যজনক মৃত্যু। পুলিশ লাশটা উদ্ধার করার সময় ছুড়িটা তার গলার ভিতরেই বিদ্ধ অবস্থায় পায়। ডান পাশ থেকে কাত হয়ে ঢুকে স্বরনালী ভেদ করে বের হয়ে রয়েছিল অপর প্রান্ত থেকে।
ইতিমধ্যেই জাকির সাহেবের মত ডেডিকেটেড একজন জার্নালিস্ট এর এরকম মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন ইটালী এর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা রা।
বাসার সামনের দিকের ভিড়ে একটু উঁকি দেয় বর্ণ। সাথে সাথে তাকে উদ্দেশ্য করে সাংবাদিক দের চিৎকার চেঁচামিচি শুরু হয়ে যায়। একদল আবর্জনা যেন এসে বর্ণের কানে ঢুকে গেল এমন একটা অবস্থা। বাইরে কিছু পুলিশ ছিল যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ বাড়ির ভিতরে ঢুকে পরতে না পারে। তাদের একজনকে গিয়ে বর্ণ বলে আসে, লিন্ডা খুবই অসুস্থ। সে এখন কোন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে পারবে না। তারা যেন চলে যায়।
সিকিউরিটি পুলিশ তাদেরকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে। একে একে সব ভীড় কমে যায়। বাইরের জটলা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে যায়।
বাসায় দুজন হেল্পিং হ্যান্ড আছে। দুজনেই মমধ্যবয়সী মহিলা। তারা রান্না সেরে ঘরদোর গুছিয়ে চলে যায়। লিন্ডা তার রুমে ঘুমাচ্ছে। বর্ণ ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে টিভি অন করে।টিভি অন করার পর ই নড়েচড়ে বসতে হয় তাকে। পুলিশ যখন লাশটাকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিল তখন জার্নালিস্ট রা লাশটির কিছু ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম হন। প্রায় সব নিউজ পোর্টালেই এই একটা নিউজ ই দেখাচ্ছে। টিভি বন্ধ করে দেয় বর্ণ।
সোফার উপর হেলান দিয়ে শুয়ে থাকে। রাতে ঠিকভাবে না ঘুমাতে পারায় আস্তে আস্তে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় সে।ঘুম ভাংগে বাসার বাইরে ঝগড়ার শব্দে। ব্যাপার কি! উঠে বসে বর্ণ। আস্তে আস্তে গিয়ে দরজা খুলে। বাসার বাইরে তখনও পুলিশের দুজন কর্মী দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের ই একজন একটা মাঝবয়সী লোকের কলার শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আরেকজনের হাতে ইলেক্ট্রিক টেজার। পালানোর কোন রাস্তা নেই। সেই লোকটাই বারংবার চিৎকার করে তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে। সামান্য মারামারি ও বোধ হয় হয়েছিল। ।লোকটার নাক ফেটে রক্ত পরছে। পাশেই পরে আছে একটা পুরোনো আমলের ক্যামেরা। ওদের কথাবার্তা শুনে বর্ণ আসল ঘটনা বুঝতে পারে। জাকির সাহেবের রুমের সাথে লাগোয়া একটা সরু গাছ রয়েছে। সিকিউরিটির চোখ ফাঁকি দিয়ে সেই গাছে উঠে ছেলেটা রুমের ভিতরের ছবি তুলতে চেয়েছিল।কিন্তু পুরোনো মডেলের ক্যামেরাটাই তাকে বিপদে ফেলল। একটু মাত্রাতিরিক্ত শব্দ হওয়ায় সিকিউরিটি পুলিশের দায়িত্বে থাকা দুজিনের চোখ চলে যায় গাছের ডালে। এরপর সেখান থেকে নামিয়ে উত্তম মাধ্যম দিয়ে ধরে রাখা হয়েছে। একটু পর পুলিশের গাড়ি এসে তাকে নিয়ে যাবে।
বর্ণ চট করে লেদারের কালো জ্যাকেট টা গায়ে চাপিয়ে পুলিশদুজনের কাছে চলে গেল। গিয়ে নরম গলায় বলল, এক্সকিউজ মি, স্যার, হি ইজ লিন্ডা'স রিলেটিভ। হট ওয়াজ হিজ ফল্ট? বর্ণর মুখে এরকম স্যার ডাক শুনে তাদের মন কিছুটা শান্ত হয়ে গিয়েছিল। তারা দুজন বর্ণকে বুঝাতে চেষ্টা করছিল, সে গাছে উঠে উঁকি দিয়েছে , গাছ থেকে নামতে বলার পর দৌড়ে পালাতে চেয়েছে,
বর্ণ তাদের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কানে উপরে মাথার কাছে আংগুল নিয়ে একটু ঘুরালো ও মুখে ভেংচি কাটল। পুলিশ দুজনকে সে বুঝাতে চাইলো লোকটার মাথায় সমস্যা আছে। লোকটার দিকে তাকিয়ে বর্ণ সজোরে ধমক দিয়ে ইংলিশে বলল, এক্সকিউজ মি, লিন্ডা ইজ কলিং ইউ, গো ইনসাইড হোম।
ধমকের সাথে সাথে যে পুলিশটি লোকটির কলার ধরে ছিল, সে জামার কলার থেকে হাত সরিয়ে নিল। ছাড়া পেয়ে লোকটি ভাংগা ক্যামেরার টুকরোগুল জড়ো করে একটা কনফিউশন নিয়ে বাসার ভিতরের দিকে পা বাড়ালো। ভদ্রতার খাতিরে, " আই এম রিয়েল্যি সরি ফর দ্যাট ইন্সিডেন্স " বলে পুলিশ দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিল বর্ণ।
বাসায় ঢুকে দরজা লাগিয়ে সোফার উপরে বসাল লোকটিকে। এরপর ভিতরে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে দিল তাকে। লোকটি খুব দ্রুত সে পানি খেয়ে শেষ করে ওয়াশরুম কোথায় জানতে চাইল। বর্ণ দেখিয়ে দিল।
ফ্রেশ হয়ে এসে লোকটি ভাংগা ভাংগা ইংরেজীতে তাকে যা বলল, তার অর্থ এটাই, " আমি বুঝেছি আপনি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছেন। বিশ্বাস করুন আমি এজন্য কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমাকে বাঁচিয়ে আপনার লাভ কি?"
বর্ণ পায়ের উপর পা উঠিয়ে বসে তাকে কনফিডেন্টলি জিজ্ঞেস করে, ডু ইউ নো? হু আই এম? লোকটি কাচুমাচু হয়ে গুটিয়ে যায়। উত্তরে বলে, নো স্যার, সরি স্যার।
বর্ণ: এপোলোজি এক্সেপ্টেড।
বর্ণ এবং মাঝ বয়সী লোকটার সাথে এরপর যে কথাবার্তা হয়, সেটার অনুবাদ ;
বর্ণ : আপনার নাম কি?
লোকটি: ক্রিশ্চান তাইসন।
বর্ণ: পেশা?
তাইসন: নির্দিষ্ট কোথাও আমি কাজ করি না। সাংবাদিকদের কাছে ফটোগ্রাফি বিক্রি করাটাই আমার কাজ।এজন্য আমি বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করি। পরে ছবিগুল জার্নাল দের কাছে নিয়ে যাই। যারা দাম বেশি বলে তাদের কাছেই দেই।
শুনে অনেকটা নিরাশ হয়ে যায় বর্ণ।
তার মানে উনি প্রফেশনাল সাংবাদিক না, আর ওনার কাছে কোন আইডি কার্ড ও নেই।
বর্ণ: আপনি তো প্রফেশনাল জার্নালিস্ট না। আসলে আমি বর্ণ, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর।
বলা যায় ছোট খাট একটা মিশন নিয়ে এসেছি। এজন্য আমার অনেক তথ্য লাগবে। জাকির আংকেলের সাহায্যে একজন জার্নাল এজেন্টের আইডি কার্ড করিয়ে নিলে তথ্যগুল সংগ্রহ করা যেত। কিন্তু তিনি তো...
ভেবেছিলাম আপনার সাথে ডিল করব। আপনি আমার হয়ে তথ্য এনে দিবেন কিন্তু আপনিও তো প্রফেশনাল না।
তাইসন: স্যার, আপনি জানেন না, আমি প্রফেশনাল না হলেও লাইন ঘাট সব চিনি। বলতে দ্বিধা নেই আমি চাটুকারিতা করেই দু পয়সা কামাই। কোথায় কিভাবে কি করলে আপনার প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে তা আমি সব জানি। আপনি আপনার মিশন এ আমাকে সাথে রাখতে পারবেন। এই পবিত্র ক্রস ছুয়ে কথা দিচ্ছি সব কিছু আমাদের মাঝে গোপন রাখব।
গোয়েন্দারা কাউকেই বিশ্বাস করেনা। বর্ণ ও তাইসন কে বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু বর্ণ তো আর কাচা খেলোয়াড় নয়। সে ঠিকই জানে কিভাবে একজনকে ১০০% ব্যাবহার করতে হয়। একবার তো বর্ণকে খুন করার জন্য এসেছিল একজন,তাকেও ব্যাবহার করে নিজের কাজ করিয়ে নিয়ে, পরে বিশাক একটা সারপ্রাইজ দিয়েছিল লোকটি কে।
যাই হোক, তাইসন কে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে অসুবিধে হবে না। যাক, কাজ শুরু করার একটা উপায় তো পাওয়া গেল।
তাইসন কে খেতে দেয় বর্ণ।
খাওয়ার সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি সত্য কথা বলে, পাম্পেই নগরীর সেই বাসাটা সম্পর্কে গল্পের ছলেই বর্ণ জানতে চায় তাইসনের কাছে। তাইসন গড় গড় করে অনেক তথ্য বলে দেয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা চারটে সাঞ্জের লাশের ভিতরে একটার সাথে অপরটির একটুও তফাৎ ছিল না। বাসার ভিতর থেকে গাড়িটিকে নিয়ে এসে গবেষনার এ রাখা হয়েছে। এছাড়া আর তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। বাসাটার চারপাশে কিছুদিন পুলিশের পাহাড়া ছিল কিন্তু ঘরটি পুরোপুরি ফাঁকা থাকায় এখন আর তেমন কোন পাহাড়াদার নেই।তবে অদ্ভুত কিছু ঘটে কিনা সেটা জানার জন্য ক্যামেরার আওতাধীন রাখা হয়েছে পুরো ঘরটি কে। মজার ব্যপার হল,পিজার প্যাকেটগুল সব খালি ছিল। সেই খালি প্যাকেটটি ও গবেষণাগার এ আছে।
-এখান থেকে পাম্পেই এর সেই ঘরে যেতে কতক্ষন লাগবে তাইসন ?
- ২ ঘন্টার মত।
- তুমি যাবে? আমরা তাহলে ঘরটা ঘুরে দেখে আসতাম একটু।
- কবে যেতে চাচ্ছেন??
ঘড়ির দিকে তাকায় বর্ণ। বিকেল ৬ টা। সন্ধ্যা হয়ে এল বলে। আজ রাতে একটা ট্রিপ দেয়ার সময় আছে যথেষ্ট।
তবে লিন্ডাকে একা বাসায় রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।
এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন সে।
লিন্ডার রুমে গিয়ে একবার ঢু মেরে আসে বর্ণ। বেঘোরে ঘুমাতে ঘুমাতে বিছানার একদম পাশে চলে এসেছে লিন্ডা। একটু হলেই নিচে পরে যাবে এমন একটা অবস্থা। বর্ণ গিয়ে লিন্ডাকে বিছানার মাঝে রাখার জন্য এক হাত দু পায়ের হাঁটুর মাঝে নিচে রেখে অন্য হাত লিন্ডার কাঁধের নিচে দিয়ে নিয়ে ওকে জাগিয়ে বিছানার মাঝ বরাবর নিতে চেষ্টা করে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আরেকবারের জন্য ধাক্কাটা খায় বর্ণ। লিন্ডাকে এক চুল পরিমান ও নড়াতে পারছে না সে। একজন সিমসাম মেয়ের দেহ এত্ত পরিমান ভারী হতে পারে তা ধারণার বাইরে ছিল তার। লিন্ডার মুখমন্ডল এখনো লাল হয়ে আছে। চোখের চারপাশ ফুলে আছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে স্বাভাবিক ভাবেই। কিন্তু দেহ এতটা ভারী কেন!! নাকি বর্ণের শক্তি কমে গেল!! নিয়মিত জিম করা একটা ছেলে একজন মেয়েকে তুলতে পারছে না, বর্ণের নিজের ভিতরে একিটু অপমানবোধ ও কাজ করতে লাগল । নিজের শক্তি পরীক্ষা করার জন্য ড্রয়িং রুমে চলে যায় সে। খেয়ে দেয়ে সোফার উপরে ঘুম দিয়েছে তাইসন। বর্ণ একটু ইতস্ততবোধ করে আস্তে আস্তে তাইসনের হাটুর নিচ দিয়ে হাত দিয়ে অপর হাত ঘাড়ের নিচে দিয়ে উপরে তোলার চেস্টা করতেই খুব সহজেই তাইসন একদম বর্ণের আড়কোলে চলে আসে। হঠাৎ ঘুম ভেংগে যায় তাইসনের। নিজেকে বর্ণের কোলে আবিষ্কার করে সে হাসবে,কাঁদবে, নাকি লাফ দিয়ে নিচে পরবে তা বুঝতে পারে না।তার মুখে এমন একটা ভাব ফুটে উঠলো, যেন সে ফেঁসে গিয়েছে কোথাও। বর্ণ তাইসন কে নিরাপদ ভাবে সোফায় নামিয়ে রাখে। সিচুয়েশন টা বুঝতে পেরে তাইসনকে বলে, ভয় নেই।নিজের শক্তি টা একটু পরীক্ষা করলাম , অভিযানে যেতে হবে তো!! বর্ণ ওকে এটাও বুঝিয়ে বলে, লিন্ডা যাতে তাইসনকে বর্ণের ফ্রেন্ড হিসেবেই জানে।কি হচ্ছে,
তাইসন কিছু বুঝতে না পেরে ভ্যাবাচেকা খেয়ে বসে থাকে কিছুক্ষন। বর্ণ লিন্ডার রুমে যায়। ৮ ঘন্টার বেশি সময় ধরে লিন্ডা ঘুমাচ্ছে। এবার তাকে জাগানোর চেস্টা করা উচিৎ। জাগানোর আগে সর্ব শক্তি দিয়ে বর্ণ লিন্ডাকে উঠাতে চেস্টা করে শেষবারের মত। কিন্তু ফলাফল সেই একই। বিন্দু পরিমান নাড়াতেও সক্ষম হয় নি সে। তবে বর্ণ অনুমান করতে পারে, ভার টা আসলে লিন্ডার বাম পাশে খুবই বেশি।
.
চোখে মুখে পানির ছিটা দিতেই আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকায় লিন্ডা। চোখ মেলে বর্ণকে দেখে চুপচাপ কিছুক্ষন শুয়ে থাকে সে। বর্ণ কথা বলার চেস্টা করে লিন্ডার সাথে।
লিন্ডা খুব আস্তে আস্তে উঠে বসে। শরীর ভীষন ক্লান্ত তার।
চোখ থেকে গড়িয়ে আবার পানি নেমে আসে।
বর্ণ লিন্ডাকে বুঝাতে চেষ্টা করে, যেটা হয়েছে সেটা খুব অস্বাভাবিক, এটার রহস্যভেদ করতে হলে লিন্ডার সাহায্যের দরকার পরবে সবচেয়ে বেশি। বর্ণ সিচুয়েশন একটু হালকা করতে লিন্ডাকে নিজের গল্প শোনায়, নিজের মা বাবা দুজনেই খুব করুণ ভাবে মারা গিয়েছে,এমন একটা গল্প বানিয়ে বলে ফেলে সে। বর্ণ বুঝতে পারে লিন্ডা আগের থেকে কিঞ্চিৎ পরিমান বেটার ফিল করছে। কিন্তু ওর সাথে আলোচনা করার মত সিচুয়েশন আসে নি এখনো। অনেক কষ্টে ওর সাথে কথা বলে বাসায় কাজ করা একজন বুয়ার নাম্বার সংগ্রহ করে তাকে ফোন দেয় বর্ণ। আজ রাতে লিন্ডার সাথে থাকার জন্য অফার করে। প্রথমে রাজি না হলেও কিছু টাকা পয়সার লোভ দেখানোর পরে ঠিকই রাজি হয়ে যায়।
এক ঘন্টার ভিতরেই কাজের বুয়া তার ১৬ বছরের মেয়ে সহ লিন্ডার বাসায়, লিন্ডার সাথে রাতে থাকার জন্য চলে আসে।বর্ণ খুশি হয় খুব। আজ রাতে তাহলে পাম্পেই নগরীর পরিত্যক্ত ঘর টা ঘুরে দেখা যাবে।
কিন্তু ক্যামেরা গুল থাকলে তো সমস্যা। সিসি ক্যামেরার লাইন গুল কেটে দেয়া পসিবল হবে কিনা সেটাও একটা চিন্তা।
তাইসন তার ক্যামেরাটা যতটা পারে জোড়া তালি দেয়ার চেস্টা করছে। বর্ণ গাছের উপর থেকে তোলা জাকির সাহেবের রুমের ছবিটা দেখতে ইচ্ছা প্রকাশ করলো তাইসনের কাছে।
তাইসন ক্যামেরার গ্যালারী থেকে ছবি টা বের করে বর্ণের হাতে দিল।
ছবিটা হাতে নিয়ে বর্ণ বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল। প্রতিটা জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলো। দেয়ালের অনেক জায়গায় ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে।
জামা কাপড়, বই খাতা গুল সব ছড়ানো ছিটানো।বিছানার উপরে ক্যাপ খোলা একটা কলম পরে আছে। তবে কি তিনি সুইসাইড করার আগে কিছু লিখছিলেন!! থাই গ্লাসের একটু ফাঁকা জায়গা থেকে ক্যামেরা ধরে বেশ বিস্তারিত একটা ছবি তুলেছে তাইসন। অভিজ্ঞ আছে ভাল ই বলা যায়। বর্ণ বেশ কিছুক্ষন ছবির দিকে মনোযোগ দিয়ে ডুবে ছিল,
হঠাৎ তাইসন এর ধাক্কায় হুঁশ ফেরে তার। ডায়নিং রুম থেকে জাকির সাহেবের বাসার দরজাটা দেখা যায় স্পষ্ট।
আংগুল দিয়ে তাইসন বর্ণকে সেদিকে দেখিয়ে দেয়। বর্ণ দরজার দিকে তাকায়।
ঠিক তিন সেকেন্ড পর পর একটা শব্দ ভেসে আসছে,
টুক..... টুক..... টুক...
মনে হচ্ছে কেউ বড় নখ ওয়ালা একটা আংগুল দিয়ে দরজার উপরে টোকা মেরে চলেছে।
ওপাশের ঘরে কাজের বুয়া লিন্ডাকে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। এদিকে তাইসন চলে গেলে পাম্পেই নগরীর ঘরটা ঘুরে দেখার মত অভিজ্ঞ লোক পাওয়া যাবে না। বর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, তাইসন কে নিয়ে সে পাম্পেই ঘুরে আসবে আজ রাতটা কোন ক্রমে ওরা তিনজন মিলে কাটিয়ে দিক। কোন ইঁদুর বা টিকটিকিও এরকম আওয়াজের উৎস হতে পারে।
কাজের বুয়াকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে বর্ণ তাইসন কে নিয়ে বাইরে নেমে পরে। এখানকার রাস্তাঘাট সব অপরিচিত ম গুগল ম্যাপ টা অন করে নেয় ফোনে। সাথে প্রতিরক্ষার জন্য রিভালবার নেই। যেটা আছে সেটা শুধুমাত্র দৈহিক বল।গাড়ি বা বাইক দিয়ে পাম্পেই তে যাবেনা বলে ঠিক করে তাইসন। শহর থেকে ঐদিকটায় গাড়ি বা বাইক নিয়ে যেতে দেখলে ওদেরকে ফলো করতে পারে প্রশাসনের লোকজন। " বুদ্ধিটা তাইসন এর।
যাওয়ার উপায় হিসেবে বাইসাইকেল ব্যাবহারের আয়ডিয়াটা মন্দ লাগে না বর্ণের ও।
তাইসনের শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে ছোট খাট দোকান পর্যন্ত সব কিছুই পরিচিত।
সে খুব কম সময়ের মধ্যেই দুটো বাইসাইকেল ভাড়া করে ফেলে।
তারপর ছোট খাট গলি অতিক্রম করে চলে আসে শহরের শেষ প্রান্তে। এরপর ই ছাই এর নিচে ঢাকা পরা পাম্পেই নগরীর এড়িয়া শুরু।
বর্ণ এবং তাইসন দুজনের কারো ই বিন্দু মাত্রও ধারণা ছিল না আজ রাতে তাদের সাথে কি হতে যাচ্ছে। তারা যে নিখাদ মৃত্যু কূপের দিকে পা বাড়িয়েছে এ কথাটা জানতো শুধুমাত্র লিন্ডা।
হালকা বন জংগলের রাস্তা, চারপাশে কেমন পোড়া পোড়া পরিবেশ তার ভিতর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বর্ণ এবং তাইসন। গাড়িতে যেতে দু ঘন্টার পথ। সাইকেল চালিয়ে পৌঁছাতে আরো অনেক সময় লাগবে। আধাঘণ্টা একটানা সাইকেল চালিয়ে বেশ ক্লান্ত হয়ে যায় দুজনেই।সাইকেল থামিয়ে, একটু জিড়িয়ে পানি খেয়ে নেয় তারা। হঠাৎ লিন্ডার বাসার ল্যান্ড ফোন থেকে কল আসে। বর্ণ তড়িঘড়ি করে ফোন ধরতেই
কাজের বুয়ার কন্ঠ ভেসে আসে ওপাশ থেকে।
তার বলা কথাটা ছিল এমন,
" স্যার লিন্ডা আপা আজ স্বপ্নে দেখেছে,আপনারা সাইকেল চালিয়ে একটি বাসার দিকে যাচ্ছেন। সে বাসায় ঢোকার সময় আপনাদের উপর একদল লোক হামলা করে। তারা এ পৃথিবীর কেউ না। লিন্ডা আপা আপনাকে বারণ করেছে ওদিকে যেতে।
বর্ণ ফোন কেটে সুইচ অফ করে পকেটে রেখে দেয়। লিন্ডার স্বপ্নকে অবজ্ঞা করার উপায় নেই। বর্ণ সাইকেল চালাচ্ছে সেটা ও লিন্ডার জানার কথা নয়। সুতরাং বর্ণ নিজে একটা ভাল সিদ্ধান্ত নিলেও তাইসন কে কিছুই বলে না। বেশ অনেক ক্ষন সাইকেল চালানোর পরে একটা পর্যায়ে তারা পৌঁছে যায় সেই পরিত্যক্ত বাড়িটির কাছে। ঝোপঝাড় পার হয়ে একটা খোলা জায়গা। সেই খোলা জায়গার মাঝখানেই হলো বাড়িটি।বর্ণর আদেশে তাইসন ঝোপ থেকে বের হয় নি। সাইকেলগুল বনের আরো একটু ভিতরে পার্ক করে রাখে।তারপর খোলা জায়গাটার নিকটবর্তী একটা গাছে উঠে বসে পরে দুজনেই। তাইসনের মাথায় ঢুকছে না বর্ণের এমন কাজ কারবার করার উদ্দেশ্য কি হতে পারে! তাইসনের কানের কাছে মুখ নিয়ে বর্ণ ফিসফিসিয়ে বলে, এখানেই বসে অপেক্ষা করো।কিছু ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
তাইসন বিরক্ত হচ্ছে না মোটেই। একজন গোয়েন্দার সাথে থাকলে বিরক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। সব সমঅয় রহস্যে বুঁদ হয়ে থাকা যায়। তাইসন বর্ণের মতলব বুঝতে পারুক আর না পারুক মনে মনে সেও ভাবতে শুরু করেছে, কিছু একটা হয়তবা ঘটবে। এভাবে প্রায় ১ ঘন্টা পেরিয়ে যায়। তেমন কিছুই হচ্ছে না। তাইসনের ঘুম চলে এসেছে ইতিমধ্যেই। প্যান্টের পকেট থেকে একটা কাঁচের বোতল বের করে তাইসন। ঢক ঢক করে কয়েক চুমুক পানীয় খেয়ে নেয়। বর্ণের ও তেষ্টা পেয়েছিল খুব। সাথে আনা পানি সাইকেলের সাথে রেখে এসেছে। তাইসনের পান করা পানীয় থেকে বাজে একটা গন্ধ এসে বর্ণের নাকে লাগে। তাইসনের দিকে বিরক্তিভরা চোখে তাকিয়ে সাথে সাথে চাপা গলায় ধমক দেয় বর্ণ!! এই অবস্থায় তুমি ড্রিংকস করছ???
ড্রিংকস হল সময় কাটিয়ে দেয়ার ঔষধ বর্ণ সাহেব!!এই যে দেখুন, আমি এখন মাতাল হয়ে আছি, নেশার ঘোরে কি দেখতে পাচ্ছি জানো??
বর্ণঃ কি?
তাইসনঃ(ঢুলু ঢুলু ঘুম জড়ানো কন্ঠে জানায় সে দেখছে যে,)
ঐ পরিত্যক্ত বাড়িটার দরজা, কে যেন ক্যাচ ক্যাচ করে খুলে ফেলল!!
সেখান থেকে বের হয়ে এল জাকির সাহেব । সে এখন হাওয়ায় ভেসে ভেসে বাড়িটির চারদিকে ঘুরছে, ঐ যে দেখো!! আরো একটা জাকির আংকেল বের হয়ে আসলো!! হায় হায়, সাথে দেখি সাঞ্জেও আছে!! নাহ নেশাটা ভাল ই ধরেছে!! সব মৃত মানুষের আত্মা দেখতে পাচ্ছি!!
বর্ণঃ পিছনের যে ঐ ব্লু কালারের মেয়েটা ভাসছে, ওটার নাম ই কি সাঞ্জে??
তাইসনঃ কি ব্যাপার বলো তো বর্ণ? তুমি কি না খেয়েই টাল হয়ে গেলে যে তুমিও আমার মত জাকির আংকেল আর সাঞ্জে কে দেখতে পাচ্ছ??
বর্ণঃ আমি তো সাথে লিন্ডার দুজন প্রেমিক কেও দেখতে পাচ্ছি!!
তাইসন এবার চোখ ডলে দু আংগুল দিয়ে!!
সত্যি, আরো দুজন ছেলে কে দেখতে পাচ্ছে সে।এর চেয়ে দামি মদ খেয়েও তো কখনো এমন দেখে নি সে।
ব্যাপারগুলো যে সত্য সত্য ই ঘটছে সেট বুঝতে আরো বেশ কিছুক্ষন সময় লেগে যায় তাইসনের। এবং সাথে সাথেই সে প্রচন্ড ভয় পায়। মৃত জাকির সাহেব, সাঞ্জে এবং বর্ণের ভাষ্যমতে লিন্ডার দুজন প্রেমিক বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে এটা এক প্রকারের অবিশ্বাস্য বলা যায়।ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে তাইসন। হঠাৎ বাড়ির চারপাশে চক্কর কাটতে থাকা সবায়াই নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আস্তে আস্তে শব্দের উৎস খুঁজে বর্ণদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। বর্ণ ততক্ষনে তাইসনের মুখ চেপে ধরে বসে আছে।যখনই বর্ণ এবং তাইসনের খুবই কাছাকাছি পর্যায়ে চলে এসেছিল ভাসন্ত মানুষ গুলো,ঠিক তখন ই বর্ণ ও তাইসন বুঝতে পারে, শুধুমাত্র তারাই দুজন মানুষ নয়, যারা এই লোক গুলোকে দেখছে। হঠাৎ করেই চারপাশ থেকে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়িটির আঙিনায় প্রবেশ করে একদল লোক!! বর্ণের চোখ কপালে উঠে। এরা তো এমেরিকান এসাজিন সোলজার্স " ব্লাক ক্যাটস" এদের অবস্থান কোথায় কি আছে তা বিশ্বের অন্য কারো কাছে শুধুমাত্র রহস্য একটা। ইটালীয়ান সরকার সাঞ্জের চারটে মৃতদেহ পাওয়ার খবর ফেক বলে ধামাচাপা দিয়ে দিলেও এমেরিকান দের নজর এড়ায় নি তবে। ইটালিয়ান প্রতিরক্ষা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এমেরিকান ব্লাক ক্যাটস গ্যাংরা ঠিকই ইনভেস্টিগেশন চালিয়েছে, কড়া নজর রেখেছে জায়গাটার উপর। তার মানে আজ তাইসন ও বর্ণ এই ঘরটায় প্রবেশ করলে হয়ত ব্লাক ক্যাটসের ভারী অস্ত্রের আক্রমে ঝাঝড়া হয়ে যেত নইলে এই অদ্ভুত ঘুরতে থাকা আত্মাদের হাতে ধরা পড়ত।
ভাসতে থাকা জাকির সাহেব,সাঞ্জে এবং বাকি লিন্ডার দুজন বয়ফ্রেন্ড এর চোখ পরে ব্লাক ক্যাটস গ্যাং এর উপরে। তারা ধীরে ধীরে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যায় সেদিকে।এদিকে ব্লাক ক্যাটস এর একজন ইংলিশে কমান্ড করে তাদের উদ্দেশ্যে, তারা যেখানে আছে সেখানেই যেন থেমে যায়।আরো জানায়, তাদের সাথে শান্তিপূর্ণ কমিউনিকেশন করার ইচ্ছা রয়েছে তাদের।
হাওয়ায় ভাসতে থাকা লোক গুলোর ভিতর থেকে একজন উত্তর কিছু একটা বলে উত্তর দেয়। একটু পর সেটা ইংরেজীতে ট্রান্সলেট হয়ে সবার কানে ভেসে আসে। যেটায় বলা হয়,তারা তাদের পরিচয় দিতে কিংবা কারো সাথে কমিউনিকেশন করতে আগ্রহী নয়। তাদের কাজ শেষ হলে তারা সেচ্ছায় চলে যাবে।
ব্লাক ক্যাটস এর একজন তাদের আচরণ ও কথা শুনে এলিয়েন মনে করে বসে এবং জাকির সাহেবের চেহারার মানুষটি সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় তার দিকে তাক করে গুলি ছুঁড়ে।
ব্লাক ক্যাটসের উদ্দেশ্য ছিল তাদের বাহন এবং তাদের শরীর নিয়ে গবেষনা করে উন্নত প্রযুক্তি এমেরিকার করায়ত্ত করে নেয়া।সেটা কাউকে খুন করে হলেও। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে বুলেট ভাসমান লোকটির গায়ে না ঢুকে তার সামনে এসে হঠাৎ থেমে যায়। পেছন থেকে একজন বলে উঠে, ইটস সো ডেঞ্জেরাস!!
মুখে বাঁকা একটা হাসি দেয় জাকির সাহেবের চেহারার লোকটা। এ হাসিটা তাচ্ছিল্যের হাসি।
যে লোকটা প্রথম তাদের উদ্দেশ্যে গুলি ছুড়েছিল তার দেহটা সাথে সাথে কয়েকটা টুকরা হয়ে গিয়ে শূন্যে ভাসতে থাকে। বড় বিভৎস সে দৃশ্য। রক্ত নাড়িভুঁড়ি গুল বাতাসে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে। ব্লাক ক্যাটসের বাকি লোক গুল বুঝতে পারে তারা খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু তারা কমিটেড। মৃত্যু নিশ্চিত হলেও মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধ করার জন্য।
তাদের সব অস্ত্র নিয়ে ফায়ারিং শুরু করে মুষলধারে। কিন্তু সব কিছুই বৃথা। একের পর এক সোলজারের দেহ টুকরো টুকরো হয়ে শূন্যে ভাসতে শুরু করে । কিন্তু হঠাৎ ভাসতে থাকা লোকগুলোর ভিতরে একজন বাধা দিয়ে বসে। লিন্ডার এক প্রায়াত বয়ফ্রেন্ড। সে অন্যদের বুঝাতে চেষ্টা করে, বুলেটে যেহেতু তাদের কোন ক্ষতি হচ্ছে না, সুতরাং এভাবে মানুষদের কে খুন করে লাভ কি!! এ কথা শোনার পরে জাকির সাহেবের মত দেখতে লোকটা ভীষন ক্ষিপ্ত হয়ে যান। তিনি লিন্ডার বয়ফ্রেন্ডের চেহারার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে উচ্চারণ করেন।
.
.
সাথে সাথে ছেলেটির দেহ ও কয়েকটুকরোয় পরিণত হয়ে যায় এবং ব্লাক ক্যাটসদের মৃতদেহের সাথে ভাসতে শুরু করে। এদিকে গোলাগুলির শব্দ শুনে ইটালীয় প্রশাসনের টনক নড়ে। তারা শব্দ অনুসরণ করে যেট প্লেন এবং হেলিকপ্টার নিয়ে জায়গাটার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
বিষয়টা টের পেয়ে যায় অদ্ভুত লোকগুলি। একজনের হাতের তুড়িতে শূন্যে, ব্লাক হোলের মত একটা গোলাকার গর্ত তৈরি হয়। যার ওপাশে শুধুই অন্ধকার।
ব্লাক ক্যাটসের সব অস্ত্র বুলেটসহ টুকরো টুকরো হওয়া দেহ গুল সেই সাথে নিজেদের দলের একজনের মৃতদেহ নিয়ে সবাই সেই ব্লাক হোলের ভিতরে ঢুকে যায়। পরে মুখটি নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে আসে।
চারদিকে সেই আগের মতই আবার শুনশান নিরবতা। বর্ণ ভালই বুঝে এখন কি করতে হবে তাইসন কে নিয়ে লাফ দিয়ে গাছ থেকে নিচে নামে। যতটা দ্রুত পারে সাঁই সাঁই করে সাইকেল চালাতে থাকে বন জংগলের ভিতর থেকে। ইটালীয় সেনাবাহিনী বা পুলিশরা এই এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজবে। উপরে হেলিকাপ্টর সার্চ লাইট জ্বালিয়ে মহড়া দিচ্ছে। সাইকেলের সামনে লাগানো ব্যাটারির হেড লাইট জ্বালানো যাবেনা। চাঁদের আলো খুব ক্ষীন, বেশ ঝামেলার মধ্যেও দ্রুত গতিতে সাইকেল চালিয়ে ছুটে চলেছে এমন দুজন লোক, যারা আজ একটু আগেও এমন কিছু দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী ছিল, যা পৃথিবীর এক অনন্য ইতিহাস হয়ে রইবে চিরকাল।
বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয় দুজনেই।তখন প্রায় ভোর। কাজের বুয়া খাবার দেয় তাদের খাবার খেয়ে দুজনেই সোফায় গা এলিয়ে দেয়। ক্লান্ত হলেও ঘুম আসছে না তাদের।
বর্ণের মাথায় চিন্তা একটাই, ইটালীর প্রতিরক্ষার চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও এদেশে থাকা এমেরিকান স্পাই সোলজার্স, ব্লাক ক্যাটসদের চোখ কিভাবে ফাঁকি দিবে সে!! এমনও হতে পারে তাদের গাছে চড়া সহ সব কিছুই ব্লাক ক্যাটসের কোন সদস্য দেখে ফেলেছে, বাসা পর্যন্ত ফলো ও করে এসেছে!! অসম্ভব নয় কিছুই!! ছায়ার চেয়েও বেশি অস্পৃশ্য ওরা। একটা সাইলেন্ট যুদ্ধ ঘোষনা হয়ে গেল আজ থেকে, ব্লাক ক্যাটস আর বর্ণের মাঝে।দুজনের উদ্দেশ্য এক হলেও একে অপরের শত্রু এরা। এমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য অন্য দেশে এসে তাদের অস্ত্র দিয়ে হামলা চালাবে সেটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায়না।
সব কিছুর মাঝেও লিন্ডার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটাও ভুলে নি বর্ণ।
লিন্ডা ঘুমাচ্ছে তার রুমে। বর্ণ পা টিপে টিপে লিন্ডার রুমে প্রবেশ করে। বিছানার পাশের টেবিলে একটা ডায়েরী রাখা। ডায়েরী টার প্রথম পৃষ্ঠা উল্টাতেই আবারো বির্ণ রহস্যের চোরাবালি তে আটকে যায়।
সেখানে কিছু সংকেত আঁকা ছিল। অনেকটা এ রকম;
♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦ ♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦ ♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦ ♦
♦ ♦ ♦
♦
.
.
উপরের সংকেত গুলো দেখে থ হয়ে যায় বর্ণ। এটা নিয়ে সে নিজেও রিসার্চ করেছে। জিওম্যান্সি ফিগারের নকশা। যা দ্বারা হিসেব করে ভবিষ্যৎ বলা যায়।অনেক খুজেও বর্ণ শুধু ২ টা নকশা পেয়েছিল। লিন্ডার ডায়েরী তে সব গুলো নকশা আছে হয়ত। জিওম্যান্সি বিদ্যা সম্পর্কে তাহলে লিন্ডার আয়ডিয়া আছে। এজন্যই সে স্বপ্নে ভবিষ্যৎ দেখতে পায়।
জিওম্যান্সির সাহায্যে গণনা করা যিশু বা হযরত ঈসা (আ) ও জানতেন।ইহুদি আলেমগণ একজন বেশ্যাকে ঈসার নিকট শরীয়তী বিচারের জন্যে নিয়ে এলে তিনি এ্ই জিওম্যান্সির সাহায়্যে দ্রুত বের করে ফেলেন উপস্থিত ইহুদি আলেমগণের কার কার সাথে কোন কোন মহিলার অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। আর তিনি সংশ্লিষ্ট আলেমের নামের সাথে ঐ স্ত্রীলোকের নাম যুক্ত করে দ্রুত মাটিতে তা লিখে ফেলেন যা দেখতে পেয়ে আলেমগণ ঐ নারীকে ফেলে একে একে সেখান থেকে সঁটকে পড়েন।
অপর পৃষ্ঠা উল্টানোর আগেই ঘুম ভেংগে যায় লিন্ডার। বর্ণ চুপচাপ ডায়েরী টা আগের জায়গায় রেখে দেয়। বিষয়টা লিন্ডার চোখ এড়ায় নি। অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে বর্ণর দিকে তাকায় সে।
_________
চলবে...
No comments